
মানুষের নিজেদের শাসনকেই গণতন্ত্র বলে সাংহাই এর মানুষ। ফুটপাত ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক সিগনাল থেকে সবকিছুতেই আছে নাগরিক অংশগ্রহণ। আর একেই বলা হয় গণতন্ত্র। সাংহাই এর মানুষের মতে, উন্নয়নে সময় লাগে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার জন্য ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। কিছু দেশে, ঘন ঘন সরকার পরিবর্তনের কারণে এটি কঠিন হয়ে পড়ে।
সাংহাই শহরের স্কুল ও একটি নার্সিং হোমের কাছে একটি ব্যস্ত চৌরাস্তায়, যানজট এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি দীর্ঘদিন ধরে বাসিন্দাদের ভোগাচ্ছিল, বিশেষ করে সকালের ব্যস্ত সময়ে। সেখানে বাম দিকে মোড় নেওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সিগনাল ছিল না এবং বাম দিকে মোড় নেওয়া যানবাহনগুলো বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহনের পথ আটকে দিত, যার ফলে যানজটের সৃষ্টি হতো এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যেত।
চাইনিজ পিপলস পলিটিক্যাল কনসালটেটিভ কনফারেন্সের (সিপিপিসিসি) জেলা কমিটির একজন সদস্য তার প্রতিদিনের যাতায়াতের সময় সমস্যাটি লক্ষ্য করেন। সিপিপিসিসি কর্মকর্তারা বলেন, এরপর যা ঘটেছিল তা চীনের “পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়াভিত্তিক গণতন্ত্র” বাস্তবে কীভাবে কাজ করে তার একটি আদর্শ উদাহরণ।
তিনি স্থানীয় ট্রাফিক পুলিশের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করেন এবং সরকারী কর্মকর্তা ও স্থানীয়দের নিয়ে একটি পরামর্শ সভার আয়োজন করেন। একটি বাম দিকে মোড় নেওয়ার ট্রাফিক লাইট স্থাপন করা হয়। ফলে যানজটের উন্নতি হয়েছিল- কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না। বিষয়টি এখানেই শেষ হয়নি। আরও আলোচনার ফলে সবুজ বাতির ব্যবধান দশ সেকেন্ড বাড়ানো হয় এবং মোড় নেওয়া যানবাহনগুলোকে আলাদা করার জন্য লেনের ব্যবহার নতুন করে ডিজাইন করা হয়। এর ফলস্বরূপ যান চলাচল মসৃণ হয়েছে, নিরাপত্তা উন্নত হয়েছে এবং কোনো ফরমান জারির পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে একটি বাস্তব সমাধান তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সাংহাই সফরকালে একটি বাংলাদেশী গণমাধ্যম প্রতিনিধিদলের কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়, যা চীনের অংশগ্রহণমূলক ও পরামর্শমূলক হিসেবে বর্ণিত শাসন মডেলের একটি বিস্তৃত ব্যাখ্যার সূচনা করে।
প্রতিনিধিদলটি এমন একটি প্রদর্শনী কেন্দ্র পরিদর্শন করেছে, যাকে চীনা কর্মকর্তারা “পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়াভিত্তিক গণতন্ত্র” বলে অভিহিত করছেন। এই কেন্দ্রটি, যা একইসাথে একটি কর্মকেন্দ্র এবং জনসাধারণের জন্য প্রদর্শনী, তাকে “একটি জানালা ও পাঁচটি স্তম্ভ” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে দর্শনার্থীরা দেখতে পারেন কীভাবে পরামর্শ প্রক্রিয়াগুলো কাজ করে।
একটি দেয়ালে রিয়েল-টাইম ডেটা প্রদর্শিত হচ্ছিল, যেখানে কর্মকর্তারা এমন ডাটাভিত্তিক কিছু তথ্যের দিকে ইঙ্গিত করেন যা তাদের মতে এই ব্যবস্থার ব্যাপকতা তুলে ধরে: ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে কেন্দ্রটি খোলার পর থেকে ২৬০টিরও বেশি পরামর্শ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এর পাশাপাশি অসংখ্য বিদেশী প্রতিনিধিদলও এখানে পরিদর্শনে এসেছে। একজন নারী কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আজকের পর আপনাদের এই পরিদর্শনের তথ্যও এতে যুক্ত করা হবে।”
এই কেন্দ্রটি নাগরিক এবং দর্শনার্থী উভয়কেই দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনাসহ নির্বাচিত কিছু বিষয়ে ডিজিটালভাবে পরামর্শ জমা দেওয়ার সুযোগ দেয়। কর্মকর্তারা বলছেন, এটি শাসনব্যবস্থাকে দৃশ্যমান এবং ইন্টারেক্টিভ করার একটি প্রচেষ্টা।
সিপিপিসিসি সম্পর্কে এক কর্মকর্তা ব্রিফিংয়ের সময় ব্যাখ্যা করেন, সিপিপিসিসি জাতীয় শাসন ব্যবস্থার একটি অংশ। কিন্তু এর কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা আইন প্রণয়নের ক্ষমতা নেই। আমাদের ভূমিকা হলো প্রস্তাব ও পরামর্শ প্রদান করা এবং আলোচনার মাধ্যমে জনস্বার্থের বিষয়গুলো সমাধান করা।
এই ব্যবস্থার শিকড় প্রোথিত আছে ১৯৪৯ সালের সেপ্টেম্বরে, যখন গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পূর্বে সিপিপিসিসি-র প্রথম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছিল। কর্মকর্তারা জানান, সেই সভায় নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নিয়ে আলোচনা করার জন্য রাজনৈতিক দল, সংগঠন এবং বিভিন্ন সামাজিক খাতের প্রতিনিধিরা একত্রিত হয়েছিলেন।
এটি ছিল চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) নেতৃত্বে বহুদলীয় সহযোগিতা ও রাজনৈতিক পরামর্শ ব্যবস্থার সূচনা। পরবর্তী দশকগুলোতে, সিপিপিসিসি একটি “ব্যাপক দেশপ্রেমিক ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট সংগঠন”-এ রূপান্তরিত হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল একটি অভিন্ন রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে বিভিন্ন কণ্ঠস্বরকে একত্রিত করা।
বর্তমানে, সিপিপিসিসি-র সাংহাই কমিটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ব্যবসা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং সামাজিক সংগঠনসহ ৩২টি খাত থেকে আসা ৮০০-রও বেশি সদস্য রয়েছেন। সদস্যদের আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচন করা হয় এবং তাদের কাছ থেকে নির্বাচননের মাধ্যমে বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করার পরিবর্তে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান দিয়ে অবদান রাখার প্রত্যাশা করা হয়।
মূলত, সিপিপিসিসি আলোচনার মাধ্যমে কাজ করে। সদস্যরা গবেষণা পরিচালনা করেন, সেমিনার আয়োজন করেন এবং জাতীয় উন্নয়ন কৌশল থেকে শুরু করে স্থানীয় সম্প্রদায়ের উদ্বেগ পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে প্রস্তাব জমা দেন।
এর অন্যতম প্রধান ভূমিকা হলো চীনের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা- যা অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রাধিকারের রূপরেখা প্রদানকারী কেন্দ্রীয় নীতি কাঠামো সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া। চীনের প্রথম এই ধরনের পরিকল্পনা ১৯৫৩ সালে চালু হয়েছিল এবং ২০২৬ সাল এর ১৬তম চক্রের সূচনা করবে।
কর্মকর্তারা প্রতিনিধিদলকে জানান যে পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় ব্যাপক মতামত গ্রহণ করা হয়। একজন কর্মকর্তা বলেন, “আমরা আমাদের সদস্যদের গবেষণা পরিচালনা এবং সেমিনার আয়োজনের জন্য সংগঠিত করি। সমাজের কী প্রয়োজন তা আমরা শুনি, যাতে আরও ভালো পরিকল্পনা তৈরি করা যায়।”
বর্তমান পরিকল্পনা চক্রের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে শত শত সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার মধ্যে ফুড ডেলিভারির মতো উদীয়মান খাতের কর্মীদের নিয়ে অধিবেশনও অন্তর্ভুক্ত ছিল। কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন যে, শুধুমাত্র সাংহাইতেই প্রায় ২ লক্ষ ডেলিভারি ড্রাইভার রয়েছেন এবং তারা যুক্তি দেন যে নীতি নির্ধারণের জন্য তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য। ফলস্বরূপ, ডেলিভারি ড্রাইভাররাও সিপিপিসিসি-র সদস্য।
পরামর্শের ওপর এই গুরুত্বকে চীনের শাসন মডেলের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরা হয়- যা পরোক্ষভাবে, ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তনকারী নির্বাচনী ব্যবস্থাগুলোর বিপরীত।
এক কর্মকর্তা সন্তান লালন-পালনের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, “উন্নয়নে সময় লাগে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার জন্য ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। কিছু দেশে, ঘন ঘন সরকার পরিবর্তনের কারণে এটি কঠিন হয়ে পড়ে।”
চীনা কর্মকর্তারা এটিকে দীর্ঘদিনের অনুশীলনের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত বলে বর্ণনা করেছেন। তারা বলেন, এর মূল ধারণাটি হলো, জনগণের অংশগ্রহণ কেবল পর্যায়ক্রমিক ভোটদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, নীতি নির্ধারণী চক্রের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত- পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন ও তদারকি পর্যন্ত- পুরো প্রক্রিয়া জুড়েই হওয়া উচিত।
শি জিনপিং তার ‘গভর্নেন্স অফ চায়না’ বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডে বলেছেন: “গণতন্ত্র কোনো সাজসজ্জার অলঙ্কার নয়; এটি জনগণের কাঙ্খিত সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যবহৃত হয়।”
বাস্তব ক্ষেত্রে, এর অর্থ হলো মতামতের জন্য একাধিক মাধ্যম তৈরি করা: যেমন কমিউনিটি সভা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, গবেষণা পরামর্শ এবং খাতভিত্তিক আলোচনা। এর মধ্যে এই মতামতগুলোকে আনুষ্ঠানিক শাসন প্রক্রিয়ার সাথে একীভূত করাও অন্তর্ভুক্ত।
এই ধরনের একটি মডেল অন্যত্র বাস্তবায়ন করা যাবে কিনা, তা একটি অমীমাংসিত প্রশ্নই থেকে যায়। কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, বিভিন্ন দেশের ব্যবস্থা ও পরিস্থিতি ভিন্ন। তারা পরামর্শ দেন যে, রাজনৈতিক চক্রের কারণে কিছু দেশের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ করা কঠিন হতে পারে। অন্যরা অংশগ্রহণকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে।
এর পরিবর্তে তারা যে নীতির উপর জোর দিয়েছেন তা হলো, শাসনব্যবস্থা জনগণের চাহিদার প্রতি সংবেদনশীল হওয়া উচিত এবং পরামর্শ সভা তা অর্জনের একটি উপায় হতে পারে।
যদি কোনো দর্শনার্থী সাংহাইয়ের রাস্তায় হেঁটে যান, তবে তিনি প্রতিটি রাস্তার দুই পাশে রাস্তা, ভবন এবং সর্বোপরি গাছের জ্যামিতিক রেখা ও আকৃতি দেখতে পাবেন। এমন কোনো জমি নেই যেখানে সবুজ গাছ ও ফুল নেই, যা একজন মানুষকে ক্লান্ত করবে না। এখানকার মানুষের জন্য পুরো শহরটি যেন এক অক্সিজেনের প্রকোষ্ঠ।
শহরের কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে দর্শনার্থীরা সাংহাইয়ের এক ঐকতান ও ছন্দ খুঁজে পাবেন। ভবনগুলো পরিমিত প্রতিসাম্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে; রাস্তাগুলো জ্যামিতিক রেখায় একে অপরের সাথে সংযুক্ত।
সরেজমিনে ঘুরে সাংহাইকে প্রকৃতির উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া কোনো শহর বলে মনে হয় না। বরং মনে হয়েছে, শহরটি পরিকল্পিত, যেন সময়ের সাথে বোঝাপড়া করে গড়ে উঠেছে। হ্যাঁ, ইস্পাত আর কাঁচের মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু সেগুলো অন্য সবকিছুকে আড়াল করে দেয় না। রাস্তার দুপাশে গাছপালা, শহরের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে নদী, আর কোনোভাবে এই সবকিছু কোনো রকম ঘর্ষণ ছাড়াই একসাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। এই ভারসাম্য ইচ্ছাকৃত। আপনি অনুভব করতে পারবেন যে এখানকার কোনো কিছুই পুরোপুরি আকস্মিক নয়।
বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য প্রশ্নটি সাংহাইকে মডেল হিসেবে নিয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। সেটা থেকে শেখারও আছে। কারণ বাংলাদেশেও বহু নদী আছে, আছে নদীর পাড়ে শহর। কিন্তু নাই পরিকল্পনা ও সদিচ্ছা। একটু সদিচ্ছা এনে দিতে পারে সাফল্য। আমাদের সাংহাইয়ের মতো হওয়ার দরকার নাই, আমরা বাস্তবতায় আমাদের নগর ও শহরগুলোকে গড়ে তুলতে চাই। তাতেই প্রকৃতির ভারসাম্যের পাশাপাশি উন্নয়ন সম্ভব।