ড. ইউনূসের সিদ্ধান্তে লোকসানের জের টানছে অনেক কোম্পানি

দেশের বড় বড় কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থা অনেকটাই নড়বড়ে। তৈরি হয়েছে অস্বাভাবিক চাপ। বিক্রি বাড়লেও মুনাফা কমে যাওয়া এবং একের পর এক লোকসানের ঘটনায় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ড. ইউনূসের সময় নেওয়া নানা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত। কেউ কেউ সেসব সিদ্ধান্তকে এখন ‘হঠকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। অনেকক্ষেত্রে বুমেরাং হয়েছে তার সেসব সিদ্ধান্ত।
প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল, বাটা, সিঙ্গার, লাফার্জ হোলসিম, ইউনিলিভারের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো একসাথে আর্থিক সংকটে পড়ায় ব্যবসা খাতে অস্থিরতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে লাভজনক থাকা এসব কোম্পানি হঠাৎ করে লোকসানে পড়ায় প্রশ্ন উঠেছে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক নীতির কার্যকারিতা নিয়ে।
ড. ইউনূসের সরকার ক্ষমতায় এসেই সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করে। নতুন করে টাকা না ছাপানো এবং ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্তের ফলে সুদের হার ৬ -৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ শতাংশের ওপরে ওঠে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে গিয়ে কোম্পানিগুলোর মুনাফা কমে যায়। সিঙ্গার বাংলাদেশ জানিয়েছে, তাদের লোকসানের অন্যতম বড় কারণ এই উচ্চ সুদহার।
ডলারের বিপরীতে টাকার অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকে। ফলে বাজারে চাহিদা থাকলেও কোম্পানিগুলো লাভ ধরে রাখতে পারছে না।
জ্বালানি খাতে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কাতার এনার্জির সঙ্গে ৯ থেকে ১১ ডলার দরে ৯০ লাখ টন এলএনজি পাওয়ার সুযোগ থাকলেও এখন বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে শিল্পখাতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। নতুন বিনিয়োগ আসা তো দূরের কথা, পুরোনো কোম্পানিগুলোও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।
বাংলাদেশে জুতোর বাজারে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বজায় রাখা বাটা জানিয়েছে, ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে তারা সাড়ে ১৪ কোটি টাকা লোকসান করেছে। প্রশাসনিক, পণ্য বিপণন এবং সরবরাহজনিত খরচ বেড়ে যাওয়াকেই তারা কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। কোম্পানির আয় স্থিতিশীল থাকলেও সরকারের নীতিগত অস্থিরতা ও উচ্চ খরচ তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে বলে জানিয়েছে বাটা। অর্থাৎ বিক্রি ঠিক থাকলেও খরচ বেশি হওয়ার কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বাংলাদেশে কনজ্যুমার প্রোডাক্টস খাতে ইউনিলিভারকে শীর্ষ অবস্থানে ধরা হলেও প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে তাদের বিক্রি ৮ শতাংশ এবং মুনাফা ১২ শতাংশ কমেছে। মূলত ধীরগতির বিক্রি ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব এতে পড়েছে।
অন্যদিকে, প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল তিন দশক পর বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। লাভ কমে যাওয়াকে তারা এই সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
নির্মাণ খাতেও ধাক্কা লেগেছে। উন্নয়ন কার্যক্রম কমে যাওয়ায় সিমেন্টের চাহিদায় ধস নেমেছে, যা রড ও সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর জন্য বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সুদের হার বৃদ্ধি, ডলারের অস্থিরতা ও জ্বালানি ব্যয়ের চাপ মিলিয়ে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত ড. ইউনূস সরকারের সময় হওয়ায় দায়ও তার নীতির দিকে যাচ্ছে বলে মত দিয়েছেন অনেকে।
এদিকে, বিএনপি কর্মসংস্থানের অঙ্গীকার করে ক্ষমতায় এসেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদেশি কোম্পানিগুলো যদি লোকসানের কারণে বাংলাদেশ ছাড়তে শুরু করে, তাহলে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। নতুন বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহ হারাতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
বাটা, সিঙ্গার, লাফার্জ হোলসিম, ইউনিলিভারের মতো বহুজাতিক কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, ড. ইউনূসের পুরো সময়েই তারা লোকসানে ছিল। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে লাভজনকভাবে ব্যবসা করে আসছিল।
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দিচ্ছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ড. ইউনূস সরকারের কিছু পদক্ষেপ অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা থেকে রক্ষা করেছে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে সহায়তা করেছে।
সব মিলিয়ে ব্যবসা খাতের এই সংকটে ড. ইউনূসের নীতিগত সিদ্ধান্ত, বৈশ্বিক চাপ ও ব্যয় বৃদ্ধির সম্মিলিত প্রভাব কাজ করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জ/উ