চলনবিলে সরিষা চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা
গুরুদাসপুর (নাটোর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩:৪৯ পিএম

চলনবিলের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন চোখে পড়ে সরিষার হলুদ গালিচা। শীতের নরম রোদে দুলছে সরিষার ফুল, আর সেই দোলায় দুলছে কৃষকের নতুন স্বপ্ন। সয়াবিনসহ তেলবীজে দেশের উচ্চ আমদানিনির্ভরতা, বাড়তি উৎপাদন খরচ এবং বাজারের অনিশ্চয়তার বাস্তবতায় বিকল্প ফসলের খোঁজে চলনবিল অঞ্চলের কৃষকেরা ক্রমেই ঝুঁকছেন সরিষা চাষের দিকে। কম খরচে তুলনামূলক ভালো ফলন, স্বল্প সময়ে ঘরে তোলার সুবিধা এবং খৈলসহ তেলফসল হিসেবে বাড়তে থাকা চাহিদা—সব মিলিয়ে সরিষা হয়ে উঠছে কৃষকের জন্য সম্ভাবনাময় এক অর্থকরী ফসল।

বর্ষা শেষে বিলের পানি নেমে যাওয়ার পর চলনবিলে সরিষার আবাদ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি ২০২৫–২৬ মৌসুমে বৃহত্তর চলনবিল এলাকায় মোট ৯৩ হাজার ৭৩৩ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। এর মধ্যে নাটোর জেলায় ৩৮ হাজার ৯২০ হেক্টর, সিরাজগঞ্জে ৩২ হাজার ৪১৫ হেক্টর এবং পাবনায় ২২ হাজার ৩৯৮ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে।

আরও পড়ুন : বাগাতিপাড়ায় সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে ইউনিয়ন বিএনপির আলোচনা ও মতবিনিময়

নাটোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. হাবিবুল ইসলাম খান বলেন, কম খরচে স্বল্প সময়ে ভালো ফলন পাওয়ায় কৃষকরা বোরো ধানের আগে জমিতে সরিষা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। এতে জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), নাটোর জেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে নাটোরের চলনবিল অংশে ১৮ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। উপজেলা ভিত্তিতে গুরুদাসপুরে ৭ হাজার ৯০০ হেক্টর, সিংড়ায় ৮ হাজার ৩০০ হেক্টর এবং বড়াইগ্রামে প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। অধিকাংশ জমিতে ফুল ঝরে ইতোমধ্যে শুঁটি ধরতে শুরু করেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই স্থানীয় বাজারে নতুন সরিষা উঠতে পারে।

নাটোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. হাবিবুল ইসলাম খান আরও জানান, এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং উন্নত জাতের বীজ ব্যবহারের কারণে সরিষার ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত লাভ-ক্ষতি নির্ভর করবে বাজারদরের ওপর।

গুরুদাসপুর উপজেলার বিলশা গ্রামের কৃষক ফারুক সরদার বলেন,অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সরিষা ঘরে উঠবে। প্রক্রিয়াজাত শেষে বাজারে যাবে। যদি প্রতি মণ সরিষার দাম পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকার নিচে নেমে যায়, তাহলে লাভের সম্ভাবনা কমে যাবে।

আরও পড়ুন : ঢাকাগামী যাত্রীবাহী লঞ্চ থেকে উদ্ধার ১০৩ মণ জাটকা গেল এতিমখানায়

সিংড়া উপজেলার নুরপুর গ্রামের কৃষক জহুরুল ইসলাম জানান,প্রতি বিঘা জমিতে ছয় থেকে সাত মণ সরিষা হলে ভালো দাম পেলে লাভবান হওয়া সম্ভব। এর কম হলে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, কারণ বীজ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের খরচ আগের তুলনায় বেড়েছে।

কৃষকদের মতে, সরিষা শুধু একটি অর্থকরী ফসল নয়; এটি মাটির উর্বরতা রক্ষা করে, মৌচাষের প্রসার ঘটায় এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

নাটোরের চাঁচকৈড় বাণিজ্যকেন্দ্রের একজন অভিজ্ঞ আড়তদার বলেন, মৌসুমের শুরুতে ভেজা সরিষার দাম প্রতি মণ চার থেকে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে থাকতে পারে। তবে একসঙ্গে বেশি সরিষা বাজারে এলে দাম কিছুটা কমতে পারে। শুকনো ও মানসম্মত সরিষা হলে তুলনামূলকভাবে ভালো দাম পাওয়া যায়।

একজন পাইকারি ক্রেতা জানান, পরিষ্কার ও ভালোভাবে শুকানো সরিষা হলে আমরা ভালো দাম দিতে প্রস্তুত। মান বজায় রাখা গেলে বাজারে অস্থিরতাও কমবে।

আরও পড়ুন : গোপালগঞ্জের তিন বিদ্রোহী প্রার্থী বহিষ্কার

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রম জোরদার করা হলে বাজার আরও স্থিতিশীল হবে। 

এক ব্যবসায়ী বলেন, সরকারি সংগ্রহ না থাকলে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব বাড়ে, এতে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন।

চলনবিলের হলুদ সরিষা এখন শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, কৃষকের আশা ও সম্ভাবনার প্রতীক। ফসল বাজারে ওঠার আগে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের দৃষ্টি একটাই ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হওয়া। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সময়োপযোগী উদ্যোগ নিলে চলনবিল অঞ্চলের সরিষা চাষ কৃষকের টেকসই আয়ের একটি শক্ত ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


Also News   Subject:  দেশজুড়ে   নাটোর   সরিষা চাষ   কৃষক  







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft