জিটুজি মাধ্যমে নিম্নমানের সার আমদানির আড়ালে টাকা পাচারের অভিযোগ
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৫, ৯:০৭ পিএম

সার আমদানি সংক্রান্ত পরিপত্রের কোন নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে জিটুজির মাধ্যমে চায়নার বেসরকারী প্রতিষ্ঠান বানিয়া ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং লিমিটেডের কাছ থেকে নিম্নমানের সার আমদানি করছে। এই সার আমদানির আড়ালে শত শত কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জানা যায়, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে রাষ্ট্রীয়ভাবে চুক্তিবদ্ধ হয়ে জিটুজি’র মাধ্যমে সে দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সার আমদানী করে থাকে। জিটুজির চুক্তি অনুযায়ী সেই দেশের বেসরকারী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা কোন ট্রেডিং কোম্পানীর কাছ থেকে সার আমদানী করার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) লেটার অফ ক্রেডিটের (এলসি) মাধ্যমে সরকারি নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে চায়নার বানিয়া ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং লিমিটেড বিভিন্ন বেসরকারী সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে ভেজাল এবং নিম্মমানের সার বেশী মূল্যে ক্রয় করেছে। ওই প্রতিষ্ঠানকে এক্সপোর্টার সাজিয়ে দুই প্রতিষ্ঠান থেকে সার ক্রয় করলেও পরবর্তীতে দেখা যায়, বেসরকারীভাবে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বানিয়া ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং লিমিটেডের মাধ্যমে সার সরবররাহ করতে পারবে বলে অনুমতি প্রদান করে। বিএডিসি চায়নার বানিয়া ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং লিমিটেডকে সে দেশের যে কোন প্রতিষ্ঠান থেকে সার আমদানী এবং সে দেশের যে কোন বন্দর ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়ায় তারা নিম্মমানের সার রপ্তানির সুযোগ পেয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানকে রপ্তানীকারক বানিয়ে প্রথম বছর চায়নার বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ইউয়া এবং শ্যাং ফ্যাং নামের দুইটি প্রতিষ্ঠান থেকে নিম্নমানের সার ক্রয় করে। বিএডিসি লেটার অফ ক্রেডিটের (এলসি) মাধ্যমে সরকারি নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে চায়নার ওই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভেজাল এবং নিম্মমানের সার বেশি মূল্যে ক্রয় করছে।

সম্প্রতি থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত হয় ইফা কনফারেন্স। সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং ট্রেডিং কোম্পানির মালিক ও প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। সেখানে জিটুজি পদ্ধতিতে সার আমদানির নামে বাংলাদেশ থেকে যে শতশত কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হচ্ছে সেই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।  সরকারের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা সিন্ডিকেট মালয়শিয়ার সাথে জিটুজি চুক্তি করেছে যেখানে মালয়শিয়ার নিজস্ব কোন সার কারখানাই নেই। এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, ভেজাল ও নিম্মমানের সার আমদানির নামে রাষ্ট্রের টাকা লুটাপট করা হচ্ছে। সার আমদানি সংক্রান্ত পরিপত্রের নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা করা হচ্ছে না।

সূত্রে জানা যায়, চায়না থেকে যে ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সার আমদানি করা হচ্ছে সেই সারে ১৮% নাইট্রোজেন এবং ৪৬% ফসফেটসহ মোট ৬৪% থাকার কথা এলসিতে উল্লেখ রয়েছে। বাস্তবে এই ৬৪% সারের সাথে থেকে ৫৭% ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (নাইট্রোজেন ১৪% এবং ৪৩% ফসফেট) (ডিএপি) সার মিশিয়ে জাহাজিকরণ করা হচ্ছে। এখানে এলসি অনুযায়ী ৭% কম রয়েছে। যার মূল্য প্রতি টনে ১১০ ডলার কম। ডিএপি সারে নাইট্রোজেন ও ফসফেট ৬৪% হিসেবে বিএডিসি চায়না থেকে আমদানীকৃত প্রতি মেট্রিক টন সারের মূল্য জাহাজ ভাড়া ও অন্যান্য খরচসহ ৮৯০ থেকে ৮৯৫ মার্কিন ডলার করে পড়ে। কিন্তু চায়না থেকে যে ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সার আমদানি করা হচ্ছে সেই ডিএপি সারে নাইট্রোজেন ও ফসফেট রয়েছে মাত্র ৫৭%। এই নিম্মমানের ডিএপি সার মিশিয়ে জাহাজিকরন করা হচ্ছে। চায়নার বেসরকারিভাবে উৎপাদনকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ২ থেকে ৩ গ্রেডের ডিএপি সার উৎপাদন করে থাকে। সেই কারণে ৬৪% সারের সাথে ৫০% থেকে ৫৭ % সার মিশানো সহজ হচ্ছে। চায়নার লোকাল কোম্পানি বানিয়া ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং লিমিটেড প্রতি ৪০ হাজার মেট্রিক টন সারের মধ্যে ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেট্রিক টন সার রাতের অন্ধকারে মিশিয়ে জাহাজে লোড দিচ্ছে। এ সময় জাহাজের নিচে প্রথমে ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেট্রিকটন সার লোড করে। তার উপরে ২৫ থেকে ২৬ হাজার মেট্রিক টন ৬৪% নাইট্রোজেন ও ফসফেট সংযুক্ত সার লোড করানো হয়। সারের মিশ্রণটা সহজ হয়েছে বাংলাদেশী কোম্পানী কন্টিনেন্টাল ইন্সপেকশন কোং (বিডি) লিমিটেড নামের একটি অখ্যাত ও অদক্ষ কোম্পানির কারণে। এখানে এলসি অনুযায়ী ৭% হারের অতিরিক্ত ১১০ ডলার করে জাহাজ প্রতি ১৫ হাজার মেট্রিক টনের মূল্য আনুমানিক ১৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার। যা বংলাদেশী টাকায় ২০ কোটি ৬২ হাজার টাকা। এতে করে ৫০ হাজার টাকা প্রতি জাহাজ এলসির বিপরিতে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় বাংলাদেশের ১৪ কোটি চাষির সাথে প্রতারণা করা হচ্ছে। কিন্তু এর সাথে জড়িত চক্রের মূল হোতারা বরাবরই রয়ে যাচ্ছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। উল্লেখিত চায়নার ওই লোকাল কোম্পানি বানিয়া ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং লিমিটেডের দূর্নীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমেও খবর প্রকাশিত হয়েছে। গত ৩১ জুলাই সোনালী ব্যাংকের দেয়া ২৫০৭৩১ নম্বর এলসিতে বাংলাদেশী নামসর্বস্ব অখ্যাত ও অদক্ষ ইন্সপেকশন কোম্পানী কন্টিনেটাল ইন্সপেকশন কোং. (বিডি) লিমিটেডের নাম উল্লেখ করেছে। ওই প্রতিষ্ঠানটি রাজধানীর বাড্ডা থানা এলাকার ট্রপিক্যাল মোল্লা টাওয়ারে অবস্থিত। ইন্সপেকশন কোম্পানী এলসির ক্লজ অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সারের মধ্যে নাইট্রোজেন ও ফসফেট এলসি অনুযায়ী আছে কিনা এবং সারের কোয়ালিটি ও কোয়ান্টিটি বুঝে নিয়ে সারের স্পর্শকাতর এই সাটিফিকেট ইস্যু করে থাকে। এরপর রপ্তানীকারক এই সার্টিফিকেট ব্যাংকে জমা দিয়ে তার বিল উত্তোল করে নেয়। সচরাচর যে কোন পণ্য আমদানীর ক্ষেত্রে ইন্সপেকশন কোম্পানী এসজিএস (আমেরিকা) ইন্সপেক্টরেট অথবা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিদেশী কোম্পানিকে দিয়ে সারের গুণগতমান পরীক্ষা করে সাটিফিকেট ইস্যুকরণের কথা এলসিতে উল্লেখ থাকে। কিন্তু এই চক্রটি তাদের টাকা এলসির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেছে সহজভাবে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিমাসে এই সকল এলসি অডিট করে থাকলেও কিভাবে তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে টাকা পাচার করছে। নাকি বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা এলসির নামে টাকা পাচারের সহযোগিতা করছে। নাম সর্বস্ব অখ্যাত ওই প্রতিষ্ঠানটি শুধু টাকা পাচারের সহযোগিই নয় তারা দেশের ১৩ কোটি প্রান্তিক কৃষকের সাথে প্রতারণা করছে। আমদানীকৃত সারে ৫০% থেকে ৫৫% নাইট্রোজেন ও ফসফেট মেশানোর কারণে প্রতি মেট্রিক টনে ৯৫ থেকে এক’শ ডলার এলসির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। এছাড়াও এই চক্রটি একইভাবে তিউনেশিয়া এবং মরক্কো থেকে যে হাজার হাজার কোটি টাকার টিএসপি সার আমদানী করা হচ্ছে সেই সারের গুণগতমান পরীক্ষার জন্য নাম সর্বস্ব কন্টিনেটাল ইন্সপেকশন কোং (বিডি) লিমিটেডকে নিয়োগ করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কন্টিনেটাল ইন্সপেকশন কোং. (বিডি) লিমিটেড নামের কোম্পানিটির মালিক মোহাম্মদ উল্লাহ। এই মোহাম্মদ উল্লাহ গত ১৫ বছরের বেশি সময় যাবত বিএডিসি এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে বিদেশ থেকে আমদানীকৃত সারের এলসির মাধ্যমে এসব অনিয়ম, দূর্নীতি এবং দেশের প্রান্তিক কৃষকদের সাথে প্রতারণা করে আসছে। মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত মোহাম্মদ উল্লার ব্যবসায়ীক পার্টনার হলেন বিগত ফ্যাসিস আওয়ামীলীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের জামাতা পরিচয়দানকারী মো. সাব্বির হোসেন। সাব্বির হোসেন মালয়েশিয়াতে অবস্থান করে বিএডিসির এজেন্ট হিসেবে এই কাজ পরিচালনা করছে। ইন্সপেকশন কোম্পানীর বিল সাধারণত রপ্তানীকারক প্রতিষ্ঠান প্রদান করে থাকে। কিন্তু কন্টিনেটাল ইন্সেপেকশন কোং (বিডি) লিমিটেডকে বিল প্রদান করছে বিএডিসি।

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে কন্টিনেন্টাল ইন্সপেকশন কোং (বিডি) লিমিটেডের ওয়েবসাইটে দেয়া ফোন নম্বরে একাধিকবার কল দেয়া হলেও কেউ কল রিসিভ করেননি। তাই এ ব্যাপারে কারো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


Also News   Subject:  অপরাধ   সার আমদানি   বানিয়া ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং লিমিটেড   টাকা পাচার  







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft