রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দোহায় সমাহিত কাতারের সাবেক আমির
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬, ১২:২৯ পিএম

কাতারের সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন। রোববার (১২ জুলাই) রাজধানী দোহায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার দাফন সম্পন্ন হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।

রোববার সকালে কাতারের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় কার্যালয় আমিরি দিওয়ান শেখ হামাদের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে। তবে তার মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

বাদ মাগরিব দোহার ইমাম মুহাম্মদ ইবন আবদুল ওয়াহহাব মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ঐতিহ্যবাহী কাতারি পোশাক পরিহিত শোকাহত মানুষ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে সাবেক এই আমিরের জন্য দোয়া করেন।

জানাজা শেষে তার ছেলে ও বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে বাবার মরদেহ কাঁধে বহন করেন। পরে দোহার উত্তরে লুসাইল কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

আল জাজিরার প্রতিনিধি জেইন বাসরাভি জানান, পুরো আয়োজন ছিল অত্যন্ত সাদামাটা। তার ভাষ্য, শেখ হামাদকে একটি সাধারণ কবরেই দাফন করা হয়েছে। এই সরলতাই ছিল তার ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন।

তিনি বলেন, ইসলামি ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এই আয়োজন যেমন ছিল, তেমনি শেখ হামাদের জীবনাচরণও ছিল এমনই। বিপুল সম্পদের চাকচিক্যের চেয়ে তিনি দেশের মানুষের কল্যাণকেই বেশি গুরুত্ব দিতেন।

আধুনিক কাতারের স্থপতি

১৯৯৫ সালে এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি। এরপর টানা ১৮ বছর কাতারের নেতৃত্ব দেন তিনি। ২০১৩ সালে বিরল এক নজির সৃষ্টি করে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেন ছেলে শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির হাতে।

তার নেতৃত্বেই কাতার মধ্যপ্রাচ্যের একটি ছোট মরু রাষ্ট্র থেকে বিশ্বের অন্যতম ধনী ও প্রভাবশালী দেশে পরিণত হয়।

তার শাসনামলে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ২৪ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল মজুদকে কাজে লাগিয়ে কাতারের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান তিনি। ২০০৬ সালের মধ্যেই কাতার বিশ্বের সবচেয়ে বড় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রফতানিকারক দেশে পরিণত হয়।

বিশ্ব কূটনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান

শুধু অর্থনীতিই নয়, শেখ হামাদের সময় থেকেই আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রভাবশালী ভূমিকা নিতে শুরু করে কাতার। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেশটির ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বর্তমানেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান উত্তেজনাসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক সংকটে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কাতার, যার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল শেখ হামাদের আমলেই।

এছাড়া ২০২২ সালে, মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম দেশ হিসেবে ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজন করে কাতার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত শেখ হামাদকে দর্শকদের উষ্ণ অভ্যর্থনা সেই অর্জনেরই প্রতীক হয়ে ওঠে।

আল জাজিরার প্রতিষ্ঠার নেপথ্যের মানুষ

বিশ্ব গণমাধ্যমেও শেখ হামাদের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তার শাসনামলেই ১৯৯৬ সালে যাত্রা শুরু করে আল জাজিরা। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমে পরিণত হয়।

আল জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্কের মহাপরিচালক শেখ নাসের বিন ফয়সাল আল থানি এক শোকবার্তায় বলেন, শেখ হামাদই ছিলেন এই গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার মূল স্বপ্নদ্রষ্টা।

তার ভাষ্য, 'তিনি এমন একটি প্রতিষ্ঠানের বীজ বপন করেছিলেন, যা পরবর্তীতে সত্যের বাতিঘর এবং বিশ্বের প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে তিনি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে বিশ্বাস করতেন এবং সাংবাদিকতাকে দেখতেন দায়িত্ব ও আস্থার জায়গা থেকে।'

সংস্কারেও রেখেছেন ছাপ

শেখ হামাদের শাসনামলে, ২০০৪ সালে, কাতারের প্রথম স্থায়ী সংবিধান কার্যকর হয়। একই সময়ে পৌরসভা নির্বাচন চালু করা হয়, যেখানে নারীদের ভোট দেওয়া ও প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়। এসব পদক্ষেপ কাতারের রাজনৈতিক সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।

কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল্লাহ বান্দার আল-এতাইবি বলেন, শেখ হামাদ শুধু একটি দেশ পরিচালনা করেননি, তিনি কাতারের জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার রেখে গেছেন।

তার ভাষ্য, 'তিনি সাধারণ একটি দেশকে অসাধারণ রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন। শুধু কাতার নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার দৃশ্যমান। বিশেষ করে এলএনজি খাতে তার দূরদর্শী বিনিয়োগই কাতারের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় ভিত্তি তৈরি করেছে।'

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft