
সংবিধানে বলা আছে, দেশের প্রতিটি শিশুর জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈষম্যমূলক ও সর্বজনীন করা যায়নি। শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ ও নতুন নতুন বিষয় যুক্ত হলেও পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে সর্বজনীন শিক্ষার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নিম্ন মধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্টিকে শিক্ষার মূলস্রাতে নিয়ে আসতে না পারলে কোনো উদ্যোগই সফল হবে না। সর্বজনীন ও একমুখী মূল্যবোধনির্ভর শিক্ষা চালু না করতে পারলে রামিসা ও আছিয়ার মতো ঘটনা আরও ঘটতে থাকবে। এসব ঘটনা রোধ করা কখনই সম্ভব হবে না।
সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় শিশু নির্যাতন কিশোর গ্যাংসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংগঠিত হচ্ছে বলে সমাজবিজ্ঞানিরা অভিমত প্রকাশ করেন। মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসের মতে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত সারাদেশে ৫৮০ জন শিশু ধর্ষণ এবং ৩১৮ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। শিশু ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের অধিকাংশই মিস্ত্রি ও শ্রমিক শ্রেণির। সিএনজি, টেম্পু, বাস ও মাইক্রোবাসের ড্রাইভার। তাদের বেশিরভাগই স্বাক্ষরজ্ঞান-সর্বস্ব নিরক্ষর।
বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার ৬৩০টি। শিক্ষার্থী প্রায় দুই কোটি। মোট বিদ্যালয়ের মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৬৫ হাজার ৫৬৭টি, শিক্ষক প্রায় ৪ লাখ। প্রায় ৭০০ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। সর্বজনীন শিক্ষা চালু করতে হলে, প্রথমে- প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে সকল বেসরকারি স্কুল ও কিন্ডারগার্ডেন স্কুলগুলো পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দিতে হবে। ঐ সব বেসরকারি স্কুল ও কিন্ডারগার্টেনগুলোকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে নিতে আসতে হবে। দ্বিতীয়ত- প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে মেধা যাচাইয়ের নামে কোনো পরীক্ষা থাকতে পারবে না। থাকবে শুধু মূল্যায়ন পদ্ধতি। এই মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু রাখতে পারলে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ করা যাবে।
বিশ্বের প্রায় সব দেশেই প্রাথমিক পর্যায়ে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু থাকলেও আমাদের দেশে প্রায় ১১ ধরনের প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। অন্তত পাঁচ ধরনের পাঠ্যক্রম চালু আছে। ১১ ধরনের প্রতিষ্ঠান ও ৫ ধরণের পাঠ্যক্রম চালু থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে বৈষম্য। তাছাড়া প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে মেধা যাচাইয়ের নামে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়ানো হচ্ছে মানসিক চাপ। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাথমিক স্তরে এই ধরণের প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে শিক্ষা আনন্দদায়ক হওয়ার পরিবর্তে ভীতিকর হয়ে ওঠে। তাই প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে মেধা যাচাই ব্যবস্থা উঠিয়ে দিতে হবে। মেধা যাচাই ব্যবস্থা থাকলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ গরিব জনগোষ্টী প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। সমাজে যাদের অর্থবৃত্ত আছে তারাই তাদের ছেলে মেয়েদের সেই মেধা প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে পারবে।
প্রাথমিকে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলনের বিষয়টি কেবল জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-ই সীমাবদ্ধ। তা কখনও আলোর মুখ দেখেনি। এতে অভিভাবকরা সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষা দেয়ার জন্য বেছে নিচ্ছেন বেসরকারি স্কুল, মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেন বা অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এতে একদিকে শিক্ষার্থীরা অবৈতনিক শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ভিন্ন ভিন্ন পাঠ্যক্রমের কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অবৈতনিকভাবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে ৫৫ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ ৪৪ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী নিজস্ব অর্থায়নে বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে। শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে সর্বজনীন ও বিনা ব্যয়ে পড়াশোনার শতভাগ সুযোগ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্র। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষার বুনিয়াদ শক্ত না হলে শিক্ষা খাত থেকে কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা কখনই পূরণ হবে না।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষাকে বেসরকারি করণের সুযোগ দেওয়া যাবে না। বেসরকারিকরণের আড়ালে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কোচিং বাণিজ্যের নামে অর্থলোভী এক শ্রেণির শিক্ষকরা দখল করে আছে। যারা শিক্ষার পরিবর্তে অতিরিক্ত লাভের জন্য কোচিং পড়ানোকে ব্যবসার মতো পরিচালনা করছে। বর্তমানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে মেধা যাচাই বহাল থাকায় তাদের ব্যবসা আরও রমরমা।
তাছাড়া বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষকদের সংকট সব সময়ই থাকে। এ জন্য স্থানীয় পর্যায়ে ‘প্যারা শিক্ষক’ নিয়োগ করা যেতে পারে। নতুন শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি কোন বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কতজন, সে অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। এছাড়া আমাদের দেশের বেশির ভাগ শিক্ষক সুপ্রশিক্ষিত নন। শিক্ষকদের যোগ্যতা নিয়ে আছে নানা প্রশ্ন। শিক্ষকের মান বাড়াতে হলে মেধাবী ও যুগোপযোগী শিক্ষকের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। দেশের বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেরা স্কলারদেরকে প্রাথমিকে নিয়োগ দিতে হবে। যাতে করে প্রাথমিকের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা মূল্যবোধনির্ভর শিক্ষা, লিখন ও পঠনদক্ষতা বাড়াতে পারে।
শিক্ষা কার্যক্রমের বিভিন্ন পর্যায় থেকে শিক্ষার্থীদের ড্রপ আউট বা ঝরে পড়া একটি গুরুতর সমস্যা হিসাবে দেখা দিয়েছে। ড্রপ আউটের মূল কারণ শিক্ষার উচ্চব্যয় এবং শিক্ষার্থীর পারিবারিক আর্থিক সংকট। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিকাংশ পরিবারই দরিদ্র। তারা দৈনন্দিন সাংসারিক ব্যয়নির্বাহ করতেই হিমশিম খায়। সন্তানদের স্কুলে পাঠানো তাদের জন্য বিলাসিতা মাত্র। অনেক পরিবার আছে, যারা ৮-১০ বছরের একটি শিশুকে বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে তার ব্যয়ভার বহন করতে পারে না। তারা বরং এ বয়সি শিশুকে কোনো কারখানা বা বাড়িতে কাজে নিয়োগ দিয়ে কিছু বাড়তি আয়ের সুযোগ নেয়। মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও জটিল। আর্থিক সমস্যার পাশাপাশি তারা মেয়েদের নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে চিন্তিত থাকে বেশি। দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশ প্রাথমিক শিক্ষা সমাপন করতে পারে। আমাদের দেশে শিক্ষা গ্রহণের ব্যয় অনেক বেশি। সর্বপর্যায়ে শিক্ষার ব্যয়ভার কমানোর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষাব্যয়কে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। প্রাইভেট শিক্ষার ব্যয়ভার অত্যন্ত বেশি। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা চাইলেই প্রাইভেট স্কুল বা কলেজে ভর্তি হতে পারে না। আবার সবার পক্ষে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সম্ভব হয় না। তাই সর্বজনীন ও একমুখী শিক্ষার প্রয়োজনে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বেসরকারি সব ধরণের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া উচিত। সরকার প্রতিবছর শিক্ষা খাতে ভর্তুকি দিচ্ছে। এ ভর্তুকির পরিমাণ ব্যাপক মাত্রায় বাড়ানো প্রয়োজন।
বিগত কয়েক বছরে দেশে কারিকুলামে বারবার পরিবর্তনও অভিভাবকদের একাংশকে সাধারণ শিক্ষা থেকে বিমুখ করে তুলেছেন। বর্তমানে অভিভাবকদের অনেকেই এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চাচ্ছেন, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষা এবং আধুনিক শিক্ষা দুটোই মিলবে। অবৈতনিক সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু এ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে যে ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন তাতে ঘাটতি রয়েছে। ফলে অনেক অভিভাবক সন্তানদের সেখানে পড়াতে আগ্রহী হন না। দেশে কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই কিন্ডারগার্টেন-মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ থাকায় ব্যাঙের ছাতার মতো অপরিকল্পিত প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে।
তাছাড়া স্কুলগুলোতে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাইকে ঢালাওভাবে উপবৃত্তি প্রদানের পরিবর্তে বিদ্যালয়ভিত্তিক তালিকা করে অতি দরিদ্র শিক্ষার্থীদের চাহিদা মাফিক বৃত্তির ব্যবস্থা করা একান্ত আবশ্যক। আজকের শিশুই আগামী দিনে দেশকে নেতৃত্ব দেবে। কোনো শিক্ষার্থী প্রাথমিক স্তরেই যদি ঝরে পড়ে, তবে এ পরিস্থিতির খেসারত দিতে হবে পুরো জাতিকেই; যা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন তথা ব্যক্তি, সমাজ ও জাতির উন্নয়নে সর্বাগ্রে প্রয়োজন প্রাথমিক শিক্ষার পরিমাণগত ও গুণগত মান উন্নয়ন। তাই, ঝরেপড়া রোধে রাষ্ট্রের সকল শক্তি ও সামর্থ্য কাজে লাগাতে হবে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার সকল নাগরিককে শিক্ষিত করে তোলা। আর প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে মেধা যাচাইয়ের এই বৈষম্যের কারণে সমাজের বিশাল জনগোষ্টী শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ছে। এই ঝরে পড়া রোধ করতে হলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বেসরকারিকরণ ও মেধা যাছাই প্রক্রিয়া দ্রুত বন্ধ করতে হবে। পরীক্ষায় ফেল করে অনেক শিক্ষার্থী অত্মহননের পথও বেচে নিচ্ছে। মেধা যাচাই পদ্ধতি উঠিয়ে দিয়ে মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করতে হবে। যাতে শিশুদের শিক্ষা গ্রহণকালে কোনো ধরণের বৈষম্য গ্রাস করতে না পারে। সবার জন্য শিক্ষা তখনই শতভাগ নিশ্চিত হবে।
লেখক: সাংবাদিক