টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে আবারও বন্যার থাবা
উত্তর-পূর্ব থেকে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বাড়ছে দুর্ভোগ, ক্ষয়ক্ষতি কমাতে দৌড়ঝাঁপ প্রশাসনের
খন্দকার হানিফ রাজা
প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬, ৬:১১ পিএম আপডেট: ১০.০৭.২০২৬ ৬:৫৩ পিএম

বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই আবারও বন্যার কবলে পড়েছে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পানির চাপে উত্তর-পূর্ব, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সিলেট, সুনামগঞ্জ, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও কক্সবাজারের অনেক এলাকায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কোথাও বাড়িঘরে পানি ঢুকেছে, কোথাও ডুবে গেছে কৃষিজমি, আবার কোথাও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি উৎকণ্ঠায় রয়েছে নদী ও পাহাড়ঘেঁষা জনপদের মানুষ।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের পূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকটি নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে মুহুরী, সুরমা, কুশিয়ারা, হালদা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বর্ষা বাংলাদেশে নতুন নয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বন্যার ধরন বদলে যাচ্ছে। এখন অল্প সময়ের ভারী বর্ষণই বড় দুর্যোগে রূপ নিচ্ছে। ফলে প্রতিবছর একই সংকট মোকাবিলার পরিবর্তে স্থায়ী ও বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধানই সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হয়ে উঠেছে।

সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতির একটি চট্টগ্রাম। কয়েক দিনের টানা বর্ষণে নগরীর অনেক এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। পাহাড়ঘেঁষা বসতিগুলোতে বেড়েছে পাহাড়ধসের আশঙ্কা। কোথাও কোথাও সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। নিচু এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার অনুরোধ করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে প্রস্তুত রয়েছে।

গত ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার ক্ষত এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি ফেনীর মানুষ। নতুন করে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর পানি বাড়তে শুরু করায় আবারও আতঙ্ক ছড়িয়েছে। নদীতীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলো প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম বলেছেন, নদীর পানি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। উজানে বৃষ্টিপাত বেড়ে গেলে অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে সতর্ক থাকতে এবং প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সিলেট ও সুনামগঞ্জে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বাড়তে থাকায় হাওরাঞ্চলের মানুষের উদ্বেগ বেড়েছে। অনেক নিচু জমিতে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। কৃষকরা দ্রুত পুকুর, মাছের ঘের ও গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। জেলা প্রশাসন আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা, নৌযান প্রস্তুত রাখা এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে সতর্ক অবস্থায় থাকতে নির্দেশ দিয়েছে।

নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের অনেক নিম্নাঞ্চলে ইতোমধ্যে পানি প্রবেশ করেছে। গ্রামীণ কাঁচা সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগে ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটছে। কৃষিজমি, সবজিক্ষেত ও মাছের ঘের পানির নিচে চলে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দ্রুত ত্রাণ সহায়তা ও ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামতের দাবি জানিয়েছেন।

খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটিতে বন্যার পাশাপাশি পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে। টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বন্যাপ্রবণ জেলাগুলোতে আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, শিশু খাদ্য, ওষুধ এবং জরুরি ত্রাণসামগ্রী মজুত রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড এবং রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবকেরা প্রয়োজনে উদ্ধার অভিযানে অংশ নিতে প্রস্তুত রয়েছে।

তবে দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু তাৎক্ষণিক ত্রাণ কার্যক্রম দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নদীর নাব্যতা হ্রাস, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, জলাবদ্ধতা, পাহাড় কাটা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতা বন্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। দীর্ঘমেয়াদে সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা, কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, টেকসই বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং আধুনিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক দিন আবহাওয়ার পরিস্থিতিই নির্ধারণ করবে বন্যার তীব্রতা। ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বর্তমানে প্লাবিত এলাকার পাশাপাশি নতুন নতুন অঞ্চলও বন্যাকবলিত হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো জনগণকে গুজবে কান না দিয়ে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া এবং জরুরি প্রয়োজনে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার আহ্বান জানিয়েছে।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft