
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। আবাসিক ভবন, রেস্তোরাঁ, ওয়ার্কশপ, গ্যারেজ এবং ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা বিধি না মেনে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। এরই মধ্যে রাজধানীর পুরান ঢাকার বংশালে একটি মোটরসাইকেলের খুচরা যন্ত্রাংশের দোকানে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দেলোয়ার হোসেন (৩৫) নামে এক ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় দগ্ধ হয়েছেন তার খালাতো ভাই নাজমুল হোসেন (৩৩)।
আজ শুক্রবার সকালে মুকিম বাজার রোডের শিয়া গলি এলাকায় ঘটে যাওয়া এ দুর্ঘটনা আবারও রাজধানীতে এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের নিরাপদ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ভোরের দিকে দোকান খোলার প্রস্তুতির সময় হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। বিস্ফোরণের অভিঘাতে দোকানের ভেতরের ভারী একটি বস্তু দেলোয়ারের মাথায় আঘাত করে। একই সঙ্গে আগুনে দগ্ধ হন তিনি ও নাজমুল। আশপাশের লোকজন ছুটে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন এবং ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেন।
দগ্ধ দুজনকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দেলোয়ারকে মৃত ঘোষণা করেন। নাজমুলকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি শঙ্কামুক্ত থাকলেও নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।
আহতদের হাসপাতালে নিয়ে আসা দোকানের কর্মচারী মো. হামিদুল ইসলাম জানান, দোকানের ভেতরে হঠাৎ গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো দোকান ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। স্থানীয়দের সহায়তায় আহতদের উদ্ধার করা হয়।
নিহত দেলোয়ার হোসেন যশোরের শার্শা উপজেলার আব্দুল খালেকের ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বংশালের মুকিম বাজার এলাকায় মোটরসাইকেলের খুচরা যন্ত্রাংশের ব্যবসা করতেন। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, তিনি এক সন্তানের জনক।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মোহাম্মদ ফারুক জানান, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। ঘটনাটি বংশাল থানাকে জানানো হয়েছে এবং আইনগত প্রক্রিয়া চলছে।
ঘটনার পর পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। প্রাথমিকভাবে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও এটি গ্যাস লিকেজ, ত্রæটিপূর্ণ সিলিন্ডার, নিয়ন্ত্রক (রেগুলেটর) সমস্যা নাকি অসাবধানতাজনিত কারণে ঘটেছে, তা তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, বিস্ফোরণের সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ণয়ে ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহার, নিম্নমানের রেগুলেটর ও পাইপ, নিয়মিত লিকেজ পরীক্ষা না করা, অতিরিক্ত তাপের মধ্যে সিলিন্ডার রাখা এবং অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকাই অধিকাংশ দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। অনেক ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তা নির্দেশিকা সম্পর্কে অবগত নয়। ফলে সামান্য অসতর্কতাও বড় দুর্ঘটনায় পরিণত হচ্ছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, শুধু দুর্ঘটনার পর তদন্ত করলেই হবে না; ঝুঁকিপূর্ণ দোকান ও প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পরিদর্শন জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে বিস্ফোরক অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বিত তদারকি বাড়ানো জরুরি।
তাদের মতে, অনুমোদিত কোম্পানির সিলিন্ডার ব্যবহার, নিয়মিত নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ এবং প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র বাধ্যতামূলক করা গেলে এ ধরনের দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
বংশালের এই দুর্ঘটনায় একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আবারও সামনে এসেছে নগর জীবনের এক নীরব ঝুঁকি। তদন্তে প্রকৃত কারণ উদঘাটনের পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে।