
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুত্ব, এরপর প্রেমের অভিনয়, নির্জন স্থানে ডেকে নেওয়া, আপত্তিকর ছবি-ভিডিও ধারণ এবং পরে ব্ল্যাকমেইল— দেশে ভয়ংকর রূপ নিয়েছে তথাকথিত ‘হানি ট্র্যাপ’ চক্র। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে সিলেট, নরসিংদী, গাজীপুর ও সাভার পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় সংঘবদ্ধ এসব চক্রের তৎপরতায় বাড়ছে উদ্বেগ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, সামাজিক সম্মানহানি ও লজ্জার ভয়কে অস্ত্র বানিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে হানিট্র্যাপেযুক্ত অপরাধীরা। প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের সুযোগ নিয়েই এসব চক্র বিস্তার লাভ করছে।
সাইবার অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অধিকাংশ ভুক্তভোগী আবেগতাড়িত হয়ে ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও কিংবা তথ্য শেয়ার করেন। পরে সেগুলোই ব্ল্যাকমেইলের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।
জানা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের তথ্যানুযায়ী, এই চক্রগুলোর প্রধান টার্গেট হচ্ছেন, সরকারি কর্মকর্তা ও অবসরপ্রাপ্ত আমলা, ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, প্রবাসী বাংলাদেশি, উঠতি বয়সী তরুণ, একাকী জীবনযাপনকারী পুরুষ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় মধ্যবয়সী ব্যক্তিসহ অন্যান্যরা। বিশেষ করে যাদের আর্থিক সক্ষমতা বেশি এবং সামাজিক মর্যাদা রয়েছে, তাদেরই বেশি টার্গেট করা হচ্ছে। এ চক্রের সদস্যরা প্রথমে ফেসবুক, ইমো, টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, টিকটক কিংবা ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। পরে ভিডিও কল, ব্যক্তিগত ছবি আদান-প্রদান কিংবা সরাসরি সাক্ষাতের মাধ্যমে ফাঁদে ফেলা হয়।
সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের তথ্যানুযায়ী, মাসে গড়ে অন্তত ৩০টির মত গুরুতর হানি ট্র্যাপ সংক্রান্ত অভিযোগ জমা পড়ছে। তবে বাস্তব সংখ্যা আরও বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা, কারণ অধিকাংশ ভুক্তভোগীই সামাজিক ও পারিবারিক সম্মানহানির ভয়ে অভিযোগ বা মামলা করেন না।
আরও জানা যায়, গত ২০২৫ সালের ১৯ এপ্রিল রাজধানীর ভাটারা এলাকার ছোলমাঈদ উত্তরপাড়ায় ভয়াবহ এক হানি ট্র্যাপের শিকার হন নোয়াখালীর ভারপ্রাপ্ত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। মডেল পরিচয়ে নাজমুন নাহার সুখী ওরফে তনয়া হোসেনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্র ধরে তাকে বাসায় ডেকে নেয় চক্রটি। সেখানে তনয়া, তার বড় বোন কামরুন নাহার আঁখি ওরফে তানিশা এবং সহযোগীরা তাকে মারধর করে এক কোটি টাকা দাবি করে। পরে পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে এসএ পরিবহনে ৫২ লাখ টাকা এবং বিকাশে আরও ৮ লাখ টাকা আদায় করা হয়। বিবস্ত্র করে ছবি-ভিডিও ধারণের পর তাকে বাড্ডার একটি গলিতে ফেলে যায় ওই চক্রের সদস্যরা। গত ২৬ এপ্রিল পুলিশ অভিযান চালিয়ে তনয়া, তানিশা, সাফাত ইসলাম ও রুমানা ইসলামকে গ্রেপ্তার করে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ১৫ লাখ ৪৬ হাজার ৫০০ টাকা। গত ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট বৃহস্পতিবার রাজধানীর শেওড়াপাড়া ও তেজগাঁও এলাকায় অভিযান চালিয়ে ডিবি পুলিশ হানি ট্র্যাপ ও চাকরির প্রলোভনে প্রতারণার অভিযোগে হানি ট্র্যাপ চক্রের ৭ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো, বিপ্লব খান, ফারিন তানহা তোফা, সম্পা আক্তার, শাহ মোহাম্মদ জোবায়ের অভিক, আল-মাসুদ, মনিকা আক্তার ও আবু সুফিয়ান।
ডিবি সূত্র জানায়, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের একটি অফিসে নিয়ে নারীদের পাশে বসিয়ে ভিডিও ধারণ করা হতো। পরে ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করত ওই চক্রটি। এরপর ২০২৫ সালের ৪ অক্টোবর শুক্রবার সাভারে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিদর্শক মো. মেহেদী হাসানকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ফাঁদে ফেলে অপহরণ করা হয়। পরে সাভার মডেল থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে ওই চক্রের সদস্য শরিফুল, জয়নাল, সাকলা আনমনা ও কাওসার হোসেন কনককে গ্রেপ্তার করে।
জানা যায়, চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি ভোরে সায়েদাবাদ জনপদ মোড় থেকে দুই ব্যক্তিকে অপহরণ করে যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল এলাকার একটি বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অজ্ঞাত দুই নারীর সঙ্গে আপত্তিকর ছবি তুলে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। পরে তাদের কাছ থেকে নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার এবং এটিএম বুথ থেকে ৫ লাখ ৩১ হাজার ৫০০ টাকা আদায় করা হয়। একই চক্রের আরেক ঘটনায় ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্রে তুলিয়া আক্তার সুমি নামের এক তরুণী এক ব্যক্তিকে ১৫ ডিসেম্বর ডেমরায় ডেকে নেয়। পরে তাকে মারধর করে আট লাখ টাকা দাবি করা হয়। ভুক্তভোগী বাধ্য হয়ে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৫০০ টাকা, নগদ অর্থ ও স্বর্ণের আংটি দিয়ে মুক্তি পান। গত ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি রোববার ও সোমবার অভিযান চালিয়ে পুলিশ তুলিয়া আক্তার সুমি, দুলালী ওরফে মীম, ওমর ফারুক, শফিকুল ইসলাম শান্ত, সজল তালুকদার, ইয়াছিন, নাছির খান, সাদ্দাম, মেহেদী হাসান শাহরিয়া, আজিজুল হাকিম টুটুল, কামরুল ইসলাম ও রাব্বিসহ ১২ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। এরই প্রেক্ষিতে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে ওয়ারী বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মল্লিক আহসান উদ্দীন সামি জানান, “এই হানি ট্র্যাপ চক্রটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সম্পর্ক তৈরি করে টার্গেট ব্যক্তিদের ফাঁদে ফেলে তাদেরকে অপহরণ করে মোটা অংকের টাকা আদায় করতো।”
এদিকে, সিলেটে সম্প্রতি হানি ট্র্যাপ চক্রের বিস্তার উদ্বেগজনক আকার নিয়েছে। বিশেষ করে তরুণ ও প্রবাসীরা বেশি টার্গেট হচ্ছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গত ৯ এপ্রিল রাতে মাহমুদুল হাসান রিফাত ও তার বন্ধু মাহফুজ আলীকে মেন্দিবাগ এলাকা থেকে কৌশলে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় শাহজালাল উপশহরের যতরপুর এলাকার একটি বাসায়। সেখানে তানজিলা আক্তার ওরফে রাবেয়া বেগম তানহা, জেসমিন আক্তার, জায়েদ আহমদ ও আব্দুল জলিলসহ চক্রের সদস্যরা ইলেকট্রিক শক দিয়ে নির্যাতন চালায় এবং বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করে। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে ১০ লাখ টাকা দাবি করে। পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে গত ১১ এপ্রিল শনিবার ভোরে কোতোয়ালী মডেল থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে চক্রের ৪ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে।
গত ৬ মে বুধবার নরসিংদী জেলা গোয়েন্দা পুলিশ হানি ট্র্যাপে ফেলে টাকা আদায় করায় জড়িত থাকায় শারমিন আক্তার ওরফে বৃষ্টি, স্মৃতি আক্তার, মো. কাইয়ুম ও ফয়সাল মিয়াকে গ্রেপ্তার করে।
পুলিশ জানায়, নারী সদস্যরা প্রথমে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে ভুক্তভোগীদের নির্জন স্থানে ডাকত। পরে অপহরণ, মারধর ও বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণের মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইল করা হতো। ফয়সাল মিয়ার বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনসহ অন্তত সাতটি মামলা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সিআইডি সাইবার পুলিশ সেন্টারের ডিআইজি মো. আবুল বাশার তালুকদার বলেন, “প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতার বিকল্প নেই। ভুক্তভোগীরা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না যে তারা সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের ফাঁদে পা দিচ্ছেন। হানি ট্র্যাপ এখন শুধু প্রতারণা নয়; এটি সংগঠিত সাইবার অপরাধে রূপ নিয়েছে। দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া না গেলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পাওে বলে জানান তিনি।“
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়েও ডিজিটাল সচেতনতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের সামাজিকভাবে হেয় না করে আইনি সহায়তায় এগিয়ে আসার পরিবেশ নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন তারা।