
দেশভেদে ভিন্ন হারে উচ্চ আমদানি শুল্ক আরোপ সর্বোচ্চ আদালতে বাতিল হওয়ায় অন্য কোনো পন্থা খুঁজছিল যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন। এরই অংশ হিসেবে এবার বাংলাদেশসহ ১৫ দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে কিনা– তা নিয়ে তদন্ত শুরুর ঘোষণা দিয়েছে দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর ইউএসটিআর। গত বুধবার ইউএসটিআর এ ঘোষণা দেয়। এসব দেশের আইন, নীতি এবং চর্চা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের জন্য অযৌক্তিক, বৈষম্যমূলক বা প্রতিবন্ধকতামূলক কিনা– তা বের করা তদন্তের উদ্দেশ্য।
যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারায় এ তদন্ত শুরুর ঘোষণা দিয়েছে ইউএসটিআর। বাংলাদেশ ছাড়া এ তালিকায় রয়েছে চীন, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, মেক্সিকো, জাপান এবং ভারত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোও এর আওতায় থাকবে। ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ বা পাল্টা পারস্পরিক শুল্ক আরোপের পর সমঝোতার মাধ্যমে তা কমাতে এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর বা চূড়ান্ত করেছিল।
বাংলাদেশ গত ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করে। চুক্তিটি এখনও কার্যকর হয়নি। চুক্তিতে বাংলাদেশের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিতে বাড়তি ১৯ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা রয়েছে। গত বছরের এপ্রিল মাসে ট্রাম্প ঘোষিত পাল্টা শুল্কহার ছিল ৩৭ শতাংশ। বাংলাদেশ সে দেশ থেকে পণ্য আমদানি বাড়ানোর নানা পদক্ষেপ নিলে ট্রাম্প প্রশাসন তা কমিয়ে ২০ শতাংশ করেছিল। তবে অর্থনীতিবিদরা বাণিজ্য চুক্তিটিতে যুক্তরাষ্ট্রকে বেশি সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে মত দিচ্ছেন। তারা বলছেন, চুক্তির কিছু ধারা অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্যকে সীমিত করে।
পাল্টা শুল্ক আরোপ-সংক্রান্ত আদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ও বাতিল ঘোষণার পর কোনো দেশই এখন নিজে থেকে চুক্তি কার্যকর করার পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এমন তদন্তের পদক্ষেপ নিয়ে থাকতে পারে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে।
তদন্তের আওতায় ট্রাম্প প্রশাসন খতিয়ে দেখবে, এসব দেশ তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে রাষ্ট্রীয়ভাবে এমন কোনো সহায়তা দিচ্ছে কিনা, যার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য ঢুকতে সমস্যা হচ্ছে। বিশেষত কোনো দেশে যদি নিজ দেশের শিল্পের জন্য ভর্তুকি, কর সুবিধা বা নীতি সহায়তা দিয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় বেশি উৎপাদন করার কারণে পণ্যের মূল্য যৌক্তিক মূল্যের থেকে কম থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র অন্যায্য বাণিজ্য চর্চা মনে করবে এবং সে দেশের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপ করবে।
বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্বশীল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা বলেছেন, এ ধরনের তদন্তের আওতায় বাংলাদেশের নাম থাকার কথা নয়। বাংলাদেশ এলডিসিভুক্ত দেশ। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে সরকার বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি ও নীতি সহায়তা দিতে পারে। তাছাড়া এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিনস গ্রিয়ার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যে যেসব দেশের বড় বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে অথবা যেখানে চাহিদা ও উৎপাদন সক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন আছে মর্মে প্রমাণ পাওয়া গেছে, সেসব দেশই মূলত তদন্তের আওতায় এসেছে।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, অন্যায্য বাণিজ্য চর্চার অভিযোগে শুরু হওয়া তদন্তের ফলে আগামী গ্রীষ্মের মধ্যেই কিছু দেশের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। সম্ভাব্য শুল্কের মুখে পড়তে পারে চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং মেক্সিকো।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির এমন অভিযোগ এরই মধ্যে প্রত্যাখ্যান করেছে চীন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাও জিয়াকুন বলেন, অতিরিক্ত উৎপাদনের অভিযোগ ‘ভিত্তিহীন’। এই অজুহাতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ এবং একতরফা শুল্ক ব্যবস্থার সব ধরনের পদক্ষেপের বিরোধী। এদিকে তাইওয়ান জানিয়েছে, তদন্তে উত্থাপিত হতে পারে এমন অনেক বিষয়ে গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্যচুক্তিতে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রধান নির্দেশনা হিসেবে বহাল থাকবে।
বাংলাদেশের অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপ নিয়ে আপাতত উদ্বেগের কোনো কারণ নেই বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। তিনি সমকালকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে কোনো দেশে উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি করা হচ্ছে বা ভর্তুকি দিয়ে উৎপাদন টিকিয়ে রাখা হচ্ছে, সে বিষয়ে তারা তদন্ত করতে পারে। এলডিসি হওয়ায় বাংলাদেশ বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী রপ্তানিতে ভর্তুকি দিতে পারে। তাই তদন্তে বাংলাদেশের সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা নেই।
বাণিজ্য সচিব আরও বলেন, দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যসংক্রান্ত সব আইনকানুন প্রকাশ্য এবং গেজেট আকারে প্রকাশিত। শ্রম আইনসহ এসব নথি অনলাইনেও উন্মুক্ত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইলে তাদের দূতাবাসের মাধ্যমে আগাম এসব তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। যদি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য জানতে চাওয়া হয়, তখন সরকার প্রয়োজনীয়ভাবে তা জানাবে।
তিনি বলেন, তদন্ত শুরু হলেও এতে বাংলাদেশের জন্য কোনো ঝুঁকি দেখছেন না। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রশ্ন বা তথ্য চাইলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সম্প্রতি স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ শীর্ষক বাণিজ্যচুক্তির বর্তমান অবস্থান বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চুক্তি-সংক্রান্ত নোটিফিকেশন বিষয়ে এখনও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো আপডেট পাওয়া যায়নি। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানালে তখন বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অতিরিক্ত উৎপাদন-সংক্রান্ত তদন্তে বাংলাদেশের নাম থাকা কিছুটা অস্বস্তিকর বলে মনে করছেন পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা। তবে তারা মনে করেন, এ তদন্তে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সমকালকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তে অন্য ১৫ দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের নাম আসা যৌক্তিক নয়। এটি অস্বস্তিকর। তবে যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু তদন্ত শুরু করেছে, সে ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করছে, যেমন ভর্তুকি দিয়ে অতিরিক্ত উৎপাদন ধরে রাখা বা বৈশ্বিক বাজারে ডাম্পিংয়ের মতো চর্চা– বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তেমন পরিস্থিতি নেই। তাই তদন্ত সঠিকভাবে হলে বাংলাদেশ এ ধরনের অভিযোগ থেকে মুক্ত থাকবে বলেই তারা আত্মবিশ্বাসী।
বিজিএমইএর সভাপতি আরও বলেন, শ্রম অধিকার-সংক্রান্ত সংস্কারের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকার, মালিকপক্ষ এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে শ্রম আইনে সংশোধন আনা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আরও নতুন আইন ও বিধিমালা প্রণয়নের প্রক্রিয়া চলছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক মূলত দেশেই উৎপাদিত হয় এবং পরে বিদেশে রপ্তানি করা হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর সরাসরি কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না। ফলে এ ধরনের তদন্ত বড় অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য বেশি চ্যালেঞ্জিং হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। তবে বিষয়টিকে অবহেলা না করে তদন্ত প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি যথাযথভাবে তুলে ধরা জরুরি বলে মত দেন তিনি।