
একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি, সাহিত্য সম্পাদক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জাহানারা আরজু ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। সোমবার দুপুর দেড়টার দিকে গুলশানের নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি দীর্ঘদিন বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত ছিলেন। ১৯৩২ সালের ১৭ নভেম্বর তিনি ব্রিটিশ ভারতের ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জের জাবরা গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা আফিল উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী ও মা খোদেজা খাতুন। স্বামী বিচারপতি নুরুল ইসলাম ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সাবেক উপরাষ্ট্রপতি।
জাহানারা আরজু একজন প্রথিতযশা কবি। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম মহিলা সাপ্তাহিক ‘সুলতানা’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাকালীন সম্পাদক। বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত একুশে পদকসহ ২৬টি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন। তিনি ঢাকার ইডেন মহিলা কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাশ করেন। জাহানারা আরজুর প্রথম কবিতা ১৯৪৫ সালে অভিভক্ত বাংলায় ‘আজাদ’ পত্রিকার মুকুলের মাহফিলে প্রকাশিত হয়। প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তিনি মাটি, মানুষ, সমাজ ও পৃথিবীর নানা বিষয়কে তুলে ধরেছেন তার সাহিত্যকর্মে। তার রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে- নীলস্বপ্ন, রৌদ্র ঝরা গান, সবুজ সবুজ অবুঝ মন, আমার শব্দে আজন্ম আমি, ক্রন্দসী আত্মজা, বাদল মেঘে মাদল বাজে প্রভৃতি।
বাবার সঙ্গে কবি জাহানারা আরজু
অতি অল্প বয়সেই তাঁর সাহিত্যচর্চার সূচনা-অষ্টম শ্রেণিতে থাকতেই তিনি হাতে লেখা পত্রিকা ‘অঞ্জলি মোর গুঞ্জরণী’ প্রকাশ করেন। আশ্চর্যজনকভাবে এর আশীর্বচন লেখেন অবিভক্ত বাংলার কিংবদন্তি দুই ব্যক্তিত্ব-শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক ও মহাকবি কায়কোবাদ।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম মহিলা সাপ্তাহিক ‘সুলতানা’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাকালীন সম্পাদক ছিলেন তিনি। ১৯৪৯ সাল থেকে কবি সুফিয়া কামাল ও জাহানারা আরজু যৌথভাবে এই পত্রিকা সম্পাদনা করেন- যা নারী জাগরণ ও সাহিত্যচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পরবর্তীতে তিনি রাইটার্স গিল্ডের পত্রিকা ‘পরিক্রম’-এ (১৯৬৫) যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। পাশাপাশি ছিলেন টিবি অ্যাসোসিয়েশনের পাক্ষিক ‘হেলথ বুলেটিন’-এর প্রধান সম্পাদক এবং ‘সেতুবন্ধন’ সাহিত্যপত্রিকার সম্পাদনাতেও যুক্ত ছিলেন।
জাহানারা আরজুর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ১৯৪৫ সালে ‘আজাদ’ পত্রিকার মুকুলের মাহফিলে। এর পর নিয়মিত তাঁর লেখা স্থান পেতে থাকে সওগাত, মোহাম্মদী, বেগম, মিল্লাত, ইত্তেহাদ সহ বিভিন্ন পত্রিকায়। তার কবিতার মূল সুর-প্রেম, প্রকৃতি, মানুষ, সমাজ। সহজ-সরল ভাষা, আন্তরিকতা ও আবেগমাখা বর্ণনায় তিনি প্রকৃতি ও মানুষের হৃদয়ের কথা তুলে ধরেছেন তাঁর সৃষ্টিকর্মে।
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : নীলস্বপ্ন (১৯৬২), রৌদ্র ঝরা গান (১৯৬৪), সবুজ সবুজ অবুঝ মন, আমার শব্দে আজন্ম আমি, ক্রন্দসী আত্মজা, বাদল মেঘে মাদল বাজে, শোণিতাক্ত আখর (একুশে ফেব্রুয়ারি বিষয়ক স্বনির্বাচিত কবিতা, ১৯৭১)
পুরস্কার ও সম্মাননা : বাংলা সাহিত্যে অসাধারণ অবদানের জন্য তিনি ১৯৮৭ সালে একুশে পদকসহ মোট ২৬টি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। জাহানারা আরজুর স্বামী ছিলেন দেশের সাবেক উপরাষ্ট্রপতি ও বিচারপতি এ কে এম নুরুল ইসলাম।
তাঁদের চার সন্তান : বড় ছেলে মো. আশফাকুল ইসলাম, হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি, ছোট ছেলে প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাহিনুল ইসলাম, বড় মেয়ে অধ্যাপিকা মেরিনা জামান, ছোট মেয়ে প্রয়াত লুবনা জাহান নাতি-নাতনি, পুতি-পুতনি সহ অসংখ্য গুনগ্রাহী, অনুরাগী এবং শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গিয়েছেন।
মরহুমার প্রথম নামাজে জানাজা গতকাল বাদ মাগরিব গুলশানের আজাদ মসজিদে এবং দ্বিতীয় জানাজা বাদ ঈশা ও তারাবির নামাজের পর মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর থানার খলিলপুর নিজ গ্রামে অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে মরহুমাকে সেখানেই তার স্বামীর কবরের পাশে দাফন করা হয়।
জ/উ