
২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু নতুন চ্যাম্পিয়ন পাওয়ার গল্প নয়, এটি ছিল রেকর্ড ভাঙা ও নতুন ইতিহাস গড়ারও আসর। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপে ব্যালন ডি’অরজয়ী ও মনোনীত একাধিক ফুটবলার এমন সব কীর্তি গড়েছেন, যা ফুটবল ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিলেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপের শিরোপা ধরে রাখতে না পারলেও ৩৯ বছর বয়সে তিনি একের পর এক রেকর্ড নিজের নামে লিখিয়েছেন। ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে খেলা প্রথম ফুটবলারদের একজন হয়েছেন তিনি। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা, সবচেয়ে বেশি সময় মাঠে থাকা, অধিনায়ক হিসেবে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা, সবচেয়ে বেশি জয়, সবচেয়ে বেশি ম্যাচসেরা হওয়ার রেকর্ডও এখন মেসির দখলে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বয়সী হ্যাটট্রিকদাতা খেলোয়াড়ও হয়েছেন তিনি। এ ছাড়া বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি গোলে অবদান রাখার রেকর্ডও এখন তার ২১ গোল ও ১২ অ্যাসিস্ট মিলিয়ে মোট ৩৩টি গোল অবদান।
ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পেও ইতিহাস গড়েছেন। মাত্র ২৭ বছর বয়সেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন তিনি। আসরে ১০ গোল করে টানা দ্বিতীয়বারের মতো জিতেছেন গোল্ডেন বুট। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে দুই আসরে পাঁচ বা তার বেশি গোল করা প্রথম ফরাসি ফুটবলার হওয়ার কীর্তিও গড়েছেন। জাতীয় দলের হয়ে ৬৬ গোল করে তিনি ফ্রান্সের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতাও হয়েছেন।
বর্তমান ব্যালন ডি’অরজয়ী উসমান দেম্বেলে ফ্রান্সের আক্রমণে ছিলেন দুর্দান্ত। এমবাপ্পের সঙ্গে তার জুটি বিশ্বকাপে করেছে ১৬ গোল এবং ছয়টি অ্যাসিস্ট। নরওয়ের বিপক্ষে মাত্র ৩২ মিনিটে হ্যাটট্রিক করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্বিতীয় দ্রুততম হ্যাটট্রিকের মালিক হন তিনি।
ক্রোয়েশিয়ার কিংবদন্তি লুকা মদরিচের জন্য এটি ছিল শেষ বিশ্বকাপ। ২০২টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে তিনি ইতিহাসের তৃতীয় সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা ফুটবলার হয়েছেন। ঘানার বিপক্ষে অ্যাসিস্ট করে ৪০ বছর ২৯১ দিন বয়সে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সে অ্যাসিস্ট করার নতুন রেকর্ডও গড়েছেন।
পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও থেমে থাকেননি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ২৩৩ ম্যাচ খেলে তিনি সর্বাধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার রেকর্ড আরও সমৃদ্ধ করেছেন। ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করা প্রথম ফুটবলার হয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে সবচেয়ে বেশি বয়সে গোল করার কীর্তিও এখন তার। বিশ্বকাপে ১১ গোল করে ইউসেবিওকে ছাড়িয়ে পর্তুগালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন রোনালদো।
স্পেনকে বিশ্বকাপ জেতাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখা রদ্রিও অনন্য এক ইতিহাস গড়েছেন। বিশ্বকাপ, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও ব্যালন ডি'অর-এই চারটি শিরোপা জেতা ইতিহাসের মাত্র চতুর্থ ফুটবলার তিনি। পুরো টুর্নামেন্টে ৬৫৫টি সফল পাস দিয়ে এক আসরে সর্বোচ্চ সফল পাসের নতুন রেকর্ড গড়েছেন স্প্যানিশ মিডফিল্ডার।
ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইনও নিজের নাম তুলেছেন রেকর্ডবইয়ে। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি সফল পেনাল্টি থেকে গোলের রেকর্ড এখন তার। এছাড়া গ্যারি লিনেকারকে ছাড়িয়ে ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন তিনি। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেমিফাইনালে খেলেই ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা আউটফিল্ড ফুটবলারের কীর্তিও গড়েন কেইন।
স্পেনের তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল গোল ও অ্যাসিস্টে খুব বেশি আলোচনায় না থাকলেও ড্রিবলিংয়ে ছিলেন সবার ওপরে। পুরো টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ৩৫টি সফল ড্রিবল করেছেন তিনি। পাশাপাশি ২০ বছরের কম বয়সে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও বিশ্বকাপ দুই শিরোপা জেতা প্রথম ফুটবলারও হয়েছেন ইয়ামাল।
ফ্রান্সের মাইকেল অলিসেও বিশ্বকাপে সৃষ্টিশীলতার নতুন নজির গড়েছেন। পুরো টুর্নামেন্টে সাতটি অ্যাসিস্ট করে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসে এক আসরে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের নতুন রেকর্ড গড়েন। এই পথে তিনি ব্রাজিল কিংবদন্তি পেলের রেকর্ডও ভেঙে দেন।
২০২৬ বিশ্বকাপ তাই শুধু স্পেনের শিরোপা জয়ের গল্প নয়; এটি ছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় একটি আসর, যেখানে ব্যালন ডি'অরের তারকারা একের পর এক রেকর্ড ভেঙে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছেন।
জ/উ