হাসপাতাল বাড়লেও সেবার মান বাড়েনি
স্বাস্থ্যখাতে চিকিৎসা সংকটের বৃত্ত ভাঙবে কবে? বিপাকে সাধারণ মানুষ
শূন্যপদ, বাজেট অব্যবহার ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা
খন্দকার হানিফ রাজা
প্রকাশ: সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬, ৬:১৬ পিএম

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও সেবার মান নিয়ে জনঅসন্তোষ কমছে না। সরকারি হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা বাড়লেও চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবলের সংকট, বাজেট বাস্তবায়নে ধীরগতি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিতার অভাবে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ফলে চিকিৎসা গ্রহণ অনেকের কাছে মৌলিক অধিকার নয়, বরং কঠিন সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতালের নতুন ভবন নির্মাণ কিংবা শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি একা স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। পর্যাপ্ত জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং সুশাসন নিশ্চিত না হলে অবকাঠামো বিনিয়োগের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছায় না।

সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণা ও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে হাজার হাজার চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, টেকনিশিয়ান এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষকদের সংকটের কারণে একদিকে রোগীরা কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না, অন্যদিকে চিকিৎসা শিক্ষার মানও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। স্বাস্থ্য খাতের আরেকটি বড় সমস্যা বাজেট বাস্তবায়ন। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতি অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ থাকলেও ক্রয় প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং দুর্বল পরিকল্পনার কারণে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় না হয়ে ফেরত যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ওষুধ সরবরাহ, চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং হাসপাতালের সেবার ওপর।

মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় দেখা যায়, জেলা হাসপাতাল থেকে শুরু করে বড় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পর্যন্ত রোগীদের নানা ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়। কোথাও শয্যার অভাব, কোথাও দীর্ঘ অপেক্ষা, আবার কোথাও রোগী স্থানান্তর বা সাধারণ সেবা পেতেও অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের চিকিৎসা ব্যয় আরও বেড়ে যায়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে বৈষম্যও উদ্বেগজনক। অনেক রোগীর অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে সীমিত সময় ও সুযোগে চিকিৎসা মিললেও একই চিকিৎসক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তুলনামূলক বেশি সময় ও মনোযোগ দেন। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, এটি কেবল ব্যক্তিগত নয়; বরং সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার জবাবদিহিতা, কর্মপরিবেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রতিফলন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সুপারিশ অনুযায়ী, একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অন্তত ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ করা উচিত। পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ অনুপাত নিশ্চিত করাও জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশেরও কম, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন।

এছাড়া ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ (ইউএইচসি) বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনও অনেক পিছিয়ে। চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে প্রতিবছর বহু পরিবার ঋণগ্রস্ত হচ্ছে, এমনকি জমি-জমা বিক্রি করতেও বাধ্য হচ্ছে। ফলে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার পরিবর্তে চিকিৎসা ব্যয়ই অনেক পরিবারকে নতুন করে আর্থিক সংকটে ফেলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকট নিরসনে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে দ্রুত শূন্যপদ পূরণ, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় বিকেন্দ্রীকরণ, বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল নজরদারি, চিকিৎসকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা সহজলভ্য করা।

তাদের মতে, হাসপাতালভিত্তিক স্বাধীন নাগরিক তদারকি কমিটি গঠন এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য বিমা চালুর উদ্যোগও সময়ের দাবি। এতে চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ কমবে এবং সেবার মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভ‚মিকা রাখা সম্ভব হবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, স্বাস্থ্যসেবা কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি সংবিধান স্বীকৃত নাগরিক অধিকার। তাই স্বাস্থ্যখাতকে কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সুশাসন, দক্ষ জনবল, জবাবদিহিতা এবং সঠিক বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের আস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। অন্যথায় হাসপাতালের সংখ্যা বাড়লেও স্বাস্থ্যসেবার প্রকৃত সংকট থেকে মুক্তি মিলবে না।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft