বিশ্ব শিশু ক্যানসার দিবস আজ
স্বাস্থ্য ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৪:৫৯ পিএম

আজ ১৫ ফেব্রুয়ারি, বিশ্ব শিশু ক্যান্সার দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রতি বছর বিশ্ব শিশু ক্যান্সার দিবস পালন করা হয়। ২০০২ সালে চাইল্ড ক্যান্সার ইন্টারন্যাশনালের উদ্যোগে প্রথমবার এ দিবস পালন শুরু হয়। মূল লক্ষ্য হলো শিশু ক্যান্সারের প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধি, সময়মতো শনাক্তকরণ এবং প্রাথমিক চিকিৎসার গুরুত্ব তুলে ধরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানায়-প্রতিবছর প্রায় সাড়ে তিন লাখ শিশু ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে ৭০ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে, যেখানে উন্নত চিকিৎসা এবং সচেতনতা সীমিত। বাংলাদেশেও শিশু ক্যান্সারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১৫,০০০ শিশু নতুনভাবে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। শিশুদের এ রোগ শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, বরং পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক কাঠামোয়ও গভীর প্রভাব ফেলে।

শিশুক্যান্সারের কারণ :
শিশুক্যান্সার মূলত জিনগত নয়, বরং পারিপার্শ্বিক ও পরিবেশগত কারণে বেশি হয়ে থাকে। মাত্র ৫–১০ শতাংশ শিশু জিনগত কারণে আক্রান্ত হয়। বাকি ৯০–৯৫ শতাংশ শিশু পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারার প্রভাবে আক্রান্ত হয়।

মূল কারণগুলো হলো :
* পরিবেশ দূষণ: শিল্পায়ন, যানবাহন ও নগরায়নের কারণে বাতাস ও পানিতে দূষণ বৃদ্ধি।
* খাবারে রাসায়নিক ও টক্সিন: প্রক্রিয়াজাত খাবার, সংরক্ষণকারী পদার্থ ও কেমিকেল শিশুদের ঝুঁকি বাড়ায়।
* গর্ভকালীন মায়ের অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: প্রোটিন, ভিটামিন ও মিনারেল ঘাটতি শিশুর রোগপ্রবণতা বাড়ায়।
* ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের প্রভাব: গর্ভাবস্থায় বা পারিপার্শ্বিক ধূমপান ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।
* ভাইরাস সংক্রমণ: হেপাটাইটিস বি, হার্পিস এবং এইচআইভি।
* নগরায়ন ও জীবনধারার চাপ: শিশুর শারীরিক কার্যকলাপ কমে যাওয়া, অস্বাস্থ্যকর জীবনধারা।
* অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও অনিয়মিত জীবনযাপন: অতিরিক্ত চিনি, লবণ, তেল, প্রক্রিয়াজাত খাবার, কোমল পানীয়। শিশুরা আজকাল রাসায়নিকযুক্ত পানি, পরিবেশ ও খাদ্য থেকে ক্যান্সারের ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই পরিবার, স্কুল ও সমাজের সচেতনতা অপরিহার্য।

লক্ষণ ও সতর্কতা : 
শিশুক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ প্রায়ই সাধারণ অসুস্থতার মতো মনে হয়। এটি চিকিৎসা দেরি ঘটায়।

সতর্কতার মূল লক্ষণগুলো :
* অকারণে ঘন ঘন জ্বর 
* নাক বা মুখ দিয়ে বারবার রক্তপাত * অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়া
* চোখের মণি সাদা হয়ে যাওয়া
* শরীরের কোনো স্থানে টিউমার বা চাকা * দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা ও বমি
* হাড়ে ব্যথা, খুঁড়িয়ে হাঁটা 
* অতিরিক্ত দুর্বলতা ও ক্লান্তি 
* ঘন ঘন পেট ব্যথা বা হজম সমস্যা। এ লক্ষণগুলো দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া অপরিহার্য।

প্রকারভেদ :
শিশুর বয়স অনুযায়ী ক্যান্সারের ধরন ভিন্ন হয়ে থাকে। 

সাধারণত দেখা যায় :
* লিউকেমিয়া (রক্তের ক্যান্সার): শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি (~৩০–৩৫%) 
* লিম্ফোমা: লিম্ফ নোডে টিউমার
মস্তিষ্ক ও স্নায়ুর টিউমার 
* চোখের ক্যান্সার (রেটিনোব্লাস্টোমা) 
* কিডনির ক্যান্সার (উইলমস টিউমার) 
* হাড় ও মাংসপেশির ক্যান্সার (সারকোমা) 
* লিভার ক্যান্সার 
* নসিকাগ্রন্থি ও ফুসফুসের ক্যান্সার। শিশুরা ছয় মাস থেকে ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত এ ক্যান্সারের ঝুঁকিতে থাকে।

জটিলতা ও সামাজিক প্রভাব :
* দেরিতে শনাক্ত হলে ক্যান্সার শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে।
* চিকিৎসা দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল হয়।
* শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশে বাধা।
* পরিবারে মানসিক চাপ, আর্থিক বোঝা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বৃদ্ধি।
* শিশুদের শিক্ষা ব্যাহত হয়; বন্ধুত্ব ও সামাজিক সম্পর্ক সীমিত হয়। বাংলাদেশে শিশু ক্যান্সারের চিকিৎসার খরচ প্রায় ২–৪ লাখ টাকা, যেখানে উন্নত দেশে খরচ ২০–৩০ লাখ টাকা। বহু পরিবার এ খরচ বহন করতে অক্ষম।

সচেতনতা ও প্রতিরোধ :
* পুষ্টিকর খাদ্য: পালং শাক, ব্রোকলি, ডিম, মটরশুটি, কলিজা, মুরগীর মাংস, দুধ।
* নিরাপদ পরিবেশ: দূষণমুক্ত পানি ও বাতাস।
* গর্ভকালীন মায়ের যত্ন: খাদ্য ও জীবনধারা সচেতনতা।
* নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা।
* শিক্ষা ও সচেতনতা: স্কুল ও পরিবারে স্বাস্থ্য শিক্ষার অন্তর্ভুক্তি।
* মানসিক বিকাশ: শিশুর মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা।
* সামাজিক সহায়তা: শিশুর খেলা, বন্ধুত্ব ও সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি।
নিরাপদ পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সচেতনতা একত্রে কাজ করলে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

পরিবেশগত ও শিক্ষামূলক দিক : 
শিশুক্যান্সার শুধুমাত্র স্বাস্থ্য বিষয় নয়, এটি সামাজিক ন্যায্যতা, অর্থনৈতিক সামর্থ্য এবং শিক্ষার সমতার প্রতিফলন।

* স্কুলে সচেতনতা কর্মশালা।
* পরিবার ও অভিভাবকের জন্য গাইডলাইন।
* নগরায়ন ও শিল্পায়নের প্রভাব কমানো।
* খেলাধুলা ও স্বাস্থ্যকর জীবনধারায় উৎসাহ।
* শিশুদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশে সহায়তা। পরিবেশ সচেতনতা ও স্বাস্থ্য শিক্ষার মাধ্যমে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

বাংলাদেশের পরিসংখ্যান : 
* প্রতি বছর প্রায় ১৫,০০০ শিশু নতুনভাবে ক্যান্সারে আক্রান্ত।
* লিউকেমিয়া সবচেয়ে বেশি (~৩৫%)।
* চোখের ক্যান্সার, কিডনির ক্যান্সার, হাড় ও মাংসপেশির ক্যান্সারও গুরুত্বপূর্ণ।
* চিকিৎসার ব্যয় ২–৪ লাখ টাকা/শিশু।
* পরিবার ও সমাজে মানসিক চাপ ও আর্থিক বোঝা বৃদ্ধি।বিশ্বব্যাপী শিশু ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের ৯০ শতাংশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত।

সামাজিক দায়িত্ব : 
শিশুক্যান্সার শুধু চিকিৎসার বিষয় নয়, এটি সামাজিক দায়িত্ব, নৈতিক ও মানবিক বিষয়।
পরিবার ও সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি
শিশুর মানসিক ও সামাজিক সুস্থতা নিশ্চিত করা
স্বাস্থ্য সচেতনতা, নিরাপদ খাদ্য ও পরিবেশ নিশ্চিত করা
শিক্ষামূলক উদ্যোগ ও শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলার পরিবেশ তৈরি করা
শিশুদের সুস্থ ও ক্যান্সারমুক্ত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সকল স্তরের অংশগ্রহণ অপরিহার্য।

জ/উ

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft