
সিলেট অঞ্চলের গ্রামীণ সংস্কৃতি ও শীতকালীন খাদ্যঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ চুঙ্গাপুড়া পিঠা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। একসময় শীত নামলেই গ্রামবাংলার উঠোনে উঠোনে খড়কুটো জ্বালিয়ে সারা রাত ধরে চলত চুঙ্গাপুড়া পিঠা তৈরির উৎসব। আগুনের তাপে বাঁশের চুঙ্গার ভেতরে ধীরে ধীরে সেদ্ধ হতো পিঠা। সেই দৃশ্য, সেই গন্ধ আর সেই স্বাদ এখন কেবল স্মৃতিতেই রয়ে গেছে।
একসময় পৌষসংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে সিলেট ও মৌলভীবাজারের বাজারগুলোতে বসত মাছের মেলা। হাওর ও নদী থেকে ধরা টাটকা রুই, কাতলা, চিতল, বোয়াল, পাবদা, কই ও মাগুর মাছ হালকা মসলা দিয়ে ভেজে, স্থানীয় ভাষায় ‘মাছ বিরাণ’, তার সঙ্গে চুঙ্গাপুড়া পিঠা খাওয়াই ছিল ঘরোয়া উৎসবের প্রধান অনুষঙ্গ। বাড়িতে মেহমান বা নতুন জামাই এলে চুঙ্গাপুড়া পিঠা পরিবেশন না করলে সামাজিকভাবে অস্বস্তি বোধ করতেন পরিবারের লোকজন।
কালের পরিবর্তনে সেই ঐতিহ্য আজ ফিকে হয়ে এসেছে। চুঙ্গাপুড়া পিঠা তৈরির প্রধান উপকরণ ঢলু বাঁশ ও বিন্নি ধানের চাল এখন সহজলভ্য নয়। অনেক এলাকায় আগের মতো বিন্নি ধানের চাষ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ঘরে ঘরে পিঠা তৈরির সংস্কৃতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
একসময় মৌলভীবাজারের বড়লেখার পাথরিয়া পাহাড়, জুড়ীর লাঠিটিলা, রাজনগর, কমলগঞ্জের টিলা অঞ্চল, চা-বাগান ও জুড়ী উপজেলার চুঙ্গাবাড়ী এলাকায় প্রচুর ঢলু বাঁশ পাওয়া যেত। বন উজাড়, পাহাড় কাটা ও দখলের ফলে এসব এলাকা থেকে ঢলু বাঁশ প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বর্তমানে জেলার কিছু টিলায় সীমিত পরিমাণে এই বাঁশ পাওয়া গেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ফলে বাজারে ঢলু বাঁশের দামও বেড়ে গেছে।
ঢলু বাঁশ ছাড়া চুঙ্গাপুড়া পিঠা তৈরি করা যায় না বললেই চলে। এই বাঁশে থাকা বিশেষ এক ধরনের তৈলাক্ত উপাদান আগুনে বাঁশের চুঙ্গা পুড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। বাঁশের ভেতরে থাকা অতিরিক্ত রসের কারণে আগুনে পোড়ার আগেই ভেতরের পিঠা তাপে সিদ্ধ হয়ে যায়। কোনো কোনো এলাকায় বিন্নি চালের সঙ্গে দুধ, চিনি, নারিকেল ও চালের গুঁড়া মিশিয়ে পিঠা তৈরি করা হয়। পিঠা তৈরি হলে মোমবাতির মতো চুঙ্গা থেকে আলাদা হয়ে আসে। এই পিঠা পোড়াতে প্রয়োজন হয় প্রচুর পরিমাণ খড় বা নেরার।
কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সীবাজারে ঢলু বাঁশ কিনতে আসা এস কে দাস ও নির্মল এস পলাস বলেন, পৌষসংক্রান্তি ছাড়া এখন এসব জিনিস খুব একটা পাওয়া যায় না। ১০–১৫ বছর আগেও বাজারে ঢলু বাঁশ সহজেই মিলত। এখন কয়েকটি বাজার ঘুরেও পাওয়া যায় না। পরিবারের ইচ্ছায় আজ খুঁজে বের করতে হয়েছে।
কমলগঞ্জের লেখক ও কবি সাজ্জাদুল হক স্বপন বলেন, চুঙ্গাপুড়া পিঠা শুধু খাবার নয়, এটি আমাদের লোকজ সংস্কৃতির অংশ। একটু ধৈর্য ধরে চুঙ্গা খুললেই বেরিয়ে আসে এক অনন্য স্বাদ। কিন্তু প্রয়োজনীয় উপকরণ না পাওয়ায় এই ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে।
স্থানীয় সংস্কৃতিসচেতনরা বলছেন, প্রয়োজনীয় উদ্যোগ, বন সংরক্ষণ ও ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ না বাড়লে আগামী প্রজন্মের কাছে চুঙ্গাপুড়া পিঠা কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।