
জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের নারীদের প্রজননস্বাস্থ্যে দ্রুত ও গভীর প্রভাব ফেলছে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলন কপ৩০-এ মঙ্গলবার বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে আয়োজিত এক আলোচনায় তাঁরা বলেন, জলবায়ু-সম্পর্কিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বিশেষ করে নারীদের প্রজননস্বাস্থ্যের হুমকি জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় জরুরি ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায়ের নারীদের সুরক্ষায় অনুদানভিত্তিক আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করে সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিআরডি), ব্রেড ফর দ্য ওয়ার্ল্ড (বিএফটিডব্লিউ) এবং এইচইকেএস/ইপিইআর। এতে নীতিনির্ধারক, স্বাস্থ্য ও অভিযোজন বিশেষজ্ঞ, গবেষক, একাডেমিক এবং সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সিপিআরডির সহকারী ব্যবস্থাপক (রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি) শেখ নুর আতিয়া রাব্বি আলোচনায় তাঁর গবেষণাপ্রসূত ফলাফল উপস্থাপন করেন। বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলের ৪০০ প্রজননক্ষম নারীর ওপর পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা যায়—দীর্ঘদিনের জলবায়ু চাপের কারণে মাসিকের অনিয়ম, গর্ভধারণের জটিলতা, সংক্রমণ, খাদ্য ও পানি অনিরাপত্তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তিনি জানান, উচ্চ লবণাক্ত অঞ্চলে নারীদের পেলভিক ইনফ্লেমেটরি ডিজিজ (পিআইডি)–এ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ২.৩ গুণ বেশি। জলবায়ু-সম্পর্কিত চাপ গর্ভপাত, প্রাক-প্রসবসহ নানা নেতিবাচক গর্ভাবস্থা জটিলতার সম্ভাবনাও বাড়ায়। অথচ জাতীয় জলবায়ু নীতি বা অর্থায়ন কাঠামোয় এ ধরনের ঝুঁকিকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
গ্লোবাল ক্লাইমেট অ্যান্ড হেলথ অ্যালায়েন্সের নির্বাহী পরিচালক ড. জেনি মিলার বলেন, সদ্য চালু হওয়া গ্লোবাল হেলথ অ্যাডাপটেশন প্ল্যান তখনই কার্যকর হবে, যখন দেশগুলো স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অভিযোজন পরিকল্পনা করবে এবং উন্নত দেশগুলো প্রতিশ্রুত অর্থায়ন বাস্তবায়ন করবে। তাঁর ভাষায়, “নারীরা শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী নন—তাঁরাই অভিযোজনের মূল চালিকাশক্তি।”
এছাড়া সিএমসিসির পরিবেশ অর্থনীতিবিদ ও এলএসই-এর ভিজিটিং সিনিয়র ফেলো ড. সৌর দাসগুপ্ত উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের তাপপ্রবাহে বাংলাদেশে ২৯ বিলিয়ন সম্ভাব্য কর্মঘণ্টা—যা জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ—ক্ষতি হয়েছে, এবং ২০২৩ সালে অতিরিক্ত ২০ লাখ মানুষ খাদ্য অনিরাপত্তায় পড়েছে। তিনি জাতীয় তথ্যব্যবস্থাকে গ্লোবাল গোল অন অ্যাডাপটেশনের (জিজিএ) সঙ্গে সমন্বয় করার আহ্বান জানান।
ড. বিশ্বাস চিতালে অভিযোজন নীতিতে বয়স ও লিঙ্গভিত্তিক স্বাস্থ্যতথ্য আলাদা করে সংগ্রহ, জলবায়ু-সহনশীল স্বাস্থ্য নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি পূর্বাভাসে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, “নারীদের ওপর অঞ্চলভিত্তিক অস্বাভাবিক স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা এখনই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।”
রিজেনারেট আফ্রিকার জেন্ডার, হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট লিড নাকুয়া নিয়োনা কাসেকেন্ডে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন নারীদের প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর দ্রুততর হুমকি সৃষ্টি করছে। পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে মনিটরিং–ইভালুয়েশন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় জেন্ডার-সংবেদনশীলতা যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।
প্রধান অতিথি ইআরডির অতিরিক্ত সচিব এ কে এম সোহেল বলেন, স্বতন্ত্র স্বাস্থ্য–জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (Health-NAP) প্রণয়ন বৃহত্তর অভিযোজন কাঠামোয় স্বাস্থ্যখাতের অগ্রাধিকারকে দুর্বল করেছে। তিনি বলেন, “অভিযোজন নিশ্চিত করতে আমাদের দরকার মাপযোগ্য, পূর্বানুমানযোগ্য, জেন্ডার-সাড়া–দেওয়া অর্থায়ন—যা হবে অনুদানভিত্তিক, ঋণ নয়।”
তিনি আরও জানান, গত বছর বাংলাদেশকে ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে, যা অভিযোজন প্রচেষ্টাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করছে।
তিনি নারীদের জলবায়ু-প্রণোদিত স্বাস্থ্যঝুঁকিকে দ্রুত জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং জিজিএ স্বাস্থ্যসূচকের সঙ্গে দেশের অভিযোজন কৌশল সামঞ্জস্য করার ওপর বিশেষ জোর দেন।