প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, ৯:৩৮ পিএম

আলোচিত-সমালোচিত বিচারপতি একেএম জহিরুল হক। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এক টানা ১৪ বছর তিনি উচ্চ আদালতের বিচারপতি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। রাষ্ট্রের সম্মানজনক পদে বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পেয়ে একেএম জহিরুল হক দুর্নীতি ও অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তিনি দুর্নীতিতে এতটাই জড়িয়ে পড়েছিলেন যে, র ঋণ সংক্রান্ত এক রিট মামলায় অবৈধভাবে ডিগ্রি জারির মাধ্যমে রায় পরিবর্তন করার জন্য ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে আরও দুইজন বিচারপতির সঙ্গে তাকেও বিচারিক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। কিন্তু ক্ষমতার দাপটে হাইকোর্টের বিচারপতির পদটি ঠিকই ধরে রাখেন তিনি। থামিয়ে রাখেন তার বিরুদ্ধে আনীত যাবতীয় দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তও। অবশেষে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর টানা ৫ বছর বিচারিক দায়িত্ব থেকে বিরত থাকার পর ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর পদত্যাগ করেন বহুল আলোচিত বিচারপতি একেএম জহিরুর হক।
অভিযোগ উঠেছে, রাজধানীর বিজয়নগরে আইনজীবী পরিচয়ে চেম্বার খুলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে নানা ধরণের অনিয়মের খেলা শুরু করেছেন। মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে অগণিত মক্কেলের কাছ থেকে আইনি পরামর্শ দেয়া ও মামলা লড়ার নাম করে কোটি কোটি টাকা নিয়ে আদালতের ধারে-কাছেও যাচ্ছেন না। তার সঙ্গী হিসেবে রয়েছেন তার ছেলে একেএম রাশেদুল হক। বিষয়টি নিয়ে ঢাকার উচ্চ আদালত প্রাঙ্গণে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চললেও কিছুই পাত্তা দিচ্ছেন না তারা।
অভিযোগে আরও জানা যায়, বিচারপতি একেএম জহিরুল হকের আরেক ছেলে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সিনিয়র সদস্য এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ একেএম জোবায়দুল হক রাসেল। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাসেল বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা নিয়ে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন। ক্যাসিনোকান্ডে আলোচিত যুবলীগ নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের অত্যন্ত ঘনিষ্টজন হিসেবে পরিচিত হওয়ায় এবং পদ্মা সেতু প্রকল্পসহ অন্যান্য প্রকল্পে বালু ও পাথর সরবরাহের মিডিয়া ম্যান (দালালি) হয়ে এসব সম্পদ অর্জন করেন। তার মাথার উপর ছাতা হিসেবে ছিলেন ওবায়দুল কাদের। শুধু তাই নয় ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগসহ এর অঙ্গ সংগঠনে যারা পদ পেতে আগ্রহী, তাদের চাহিদামত পদ পেতেও রাসেলকে দিতে হতো মোটা অংকের টাকা।
একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করে বলেন, আইনজীবী হিসেবে মামলা পরিচালনার জন্য নিজের সাবেক বিচারপতি পরিচয়ের প্রভাব খাটিয়ে একেএম জহিরুল হক ও তার ছেলে একেএম রাশেদুল হক মোটা অংকের টাকা নিয়েও আদালতে দাঁড়াননি। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে আদালতে দাঁড়ালেও প্রতিপক্ষের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে চুপ হয়ে যান।
এর মধ্যে মো. আব্দুল হামিদ নামের এক ভুক্তভোগী অভিযোগ করে বলেন, জমিজমা সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তির জন্য তিনি বিচারপতি জহিরুল হককে ৫ কোটি টাকা দিয়েছিলেন। এরপর মাসের পর মাস তাকে নানাভাবে ঘুরিয়ে তার সাথে দুর্ব্যবহার শুরু করেন এবং চেম্বারে ঢুকতে বাধা প্রদান করেন।
রাজধানীর বনানীর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী জানান, তিনি কয়েক দফা এই পিতা-পুত্রকে দুইটি পৃথক মামলার জন্য প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা দিয়েছেন। কিন্তু একটি মামলাতেও বিন্দুমাত্র এগুনো তো দূরের কথা, উল্টো একটি মামলায় হেরে গিয়ে নানা ধরণের ঝামেলা পোহাতে হয়েছে তাকে।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে সাবেক বিচারপতি একেএম জহিরুল হকের মোবাইল নম্বরে কল দিলেও তিনি তার রিসিভ করেননি। তবে তার ছেলে সিনিয়র আইনজীবী একেএম রাশেদুল হক এসব প্রতারণার অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, অনেক দিনযাবত আইন পেশার সাথে জড়িত রয়েছি। তাদের ব্যাপারে যে অভিযোগ করা হয়েছে তা সঠিক নয়। আমরা অনেক সময় টাকা ছাড়াও ভুক্তভোগীদের আইনগত সহায়তা দিয়ে থাকি।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনবিদ ড. শাহাদিন মালিক বলেন, সাবেক বিচারপতি ও একজন সিনিয়র আইনজীবীর কাছ থেকে এ ধরণের প্রতারণা আশা করা যায় না। তবে অনেক আইনজীবীর বিরুদ্ধেই এই ধরণের অভিযোগ পাওয়া যায়। মক্কেলদের উচিত তাদের বিরুদ্ধে বার কাউন্সিলে তথ্য-প্রমাণসহ অভিযোগ করা। তথ্য-প্রমাণ না থাকলেও অভিযোগ করা যায়। আর এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে বার কাউন্সিল অবশ্যই শক্তিশালী ভুমিক গ্রহণ করেন বলে জানান তিনি।