
রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে যোগাযোগ আরও সহজ করতে তুমেন নদীর ওপর নির্মিত নতুন সড়কসেতুটি এখন উদ্বোধনের অপেক্ষায়। সীমান্তঘেঁষা এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ, আর সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি গ্রীষ্মেই এটি চালু হতে পারে—এমন ইঙ্গিত মিলছে মস্কো ও পিয়ংইয়ং উভয় দিক থেকেই।
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তাসংস্থা কেসিএনএ জানিয়েছে, সেতুর নির্মাণকাজ দ্রুত শেষের দিকে এগোচ্ছে। রাশিয়ার দূতাবাসও বলেছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগোলে আগামী ১৯ জুন নাগাদ প্রায় ৮৫০ মিটার দীর্ঘ এই সড়কসেতুর নির্মাণ শেষ হবে। সেতুটি সরাসরি রাশিয়ার হাইওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকবে, যা যাতায়াতকে আরও সহজ করবে।
এই প্রকল্পের সূচনা ২০২৪ সালে, যখন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন উত্তর কোরিয়া সফর করেন। সেই সফরেই সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই কাজ শুরু হয়ে দ্রুত এগিয়েছে।
তুমেন নদীকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার প্রায় ১৭ কিলোমিটার সীমান্ত। নদীর এক পাশে রাশিয়ার প্রিমোরস্কি ক্রাই অঞ্চলের খাসানস্কি জেলা, অন্য পাশে উত্তর কোরিয়ার রাসন শহর। এর আগে ১৯৫৯ সালে সোভিয়েত আমলে নির্মিত একটি রেলসেতু দিয়ে দুই দেশ যুক্ত ছিল। নতুন এই সড়কসেতু সেই সংযোগকে আরও বিস্তৃত করবে।
রাশিয়ার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেতুটি চালু হলে প্রতিদিন প্রায় ৩০০টি যানবাহন ও ২,৮৫০ জন যাত্রী চলাচল করতে পারবে। প্রিমোরস্কি ক্রাইয়ের গভর্নর ওলেগ কোঝেমায়াকোর মতে, এতে ভ্লাদিভস্তক ও রাসনের মধ্যকার দূরত্ব প্রায় ৩২০ কিলোমিটার কমে আসবে। ফলে বাণিজ্য, পর্যটন ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বাড়বে।
মস্কোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সেতুকে দুই দেশের সম্পর্কের একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক’ হিসেবে দেখছে। তাদের ভাষায়, এটি শুধু একটি অবকাঠামো নয়—বরং অর্থনৈতিক ও মানবিক সহযোগিতা জোরদারের একটি বাস্তব মাধ্যম।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক দ্রুত ঘনিষ্ঠ হয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপের মধ্যে থাকা এই দুই দেশ সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা বাড়িয়েছে।
২০২৪ সালে দুই দেশ একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে, যেখানে যেকোনো এক দেশ আক্রান্ত হলে অপর দেশ সহায়তা দেবে বলে উল্লেখ রয়েছে। একই বছরে উত্তর কোরিয়া হাজারো সৈন্য রাশিয়ায় পাঠায়, যারা ইউক্রেন সীমান্তের কুরস্ক অঞ্চলে মোতায়েন হয়ে যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সহায়তা করে।
সম্প্রতি রাশিয়ার কয়েকজন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা উত্তর কোরিয়া সফর করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভ্লাদিমির কোলোকোলৎসেভ দেশটির নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এর আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মিখাইল মুরাশকো ওনসান শহরে একটি যৌথ মৈত্রী হাসপাতালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
এদিকে দক্ষিণ কোরিয়া সতর্ক করে বলেছে, চীন ও রাশিয়ার সমর্থন উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতিকে কিছুটা পুনরুজ্জীবিত করছে। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এবং উচ্চ সামরিক ব্যয়ের কারণে দেশটির অর্থনীতি চাপের মধ্যে ছিল।
উত্তর কোরিয়া সাধারণত তাদের অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশ করে না। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটির জিডিপি ছিল প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার—যা দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনায় অনেক ছোট। অতীতে দেশটি তীব্র খাদ্যসংকটের মুখোমুখি হয়েছে, বিশেষ করে ১৯৯০-এর দশকের দুর্ভিক্ষে বহু মানুষের মৃত্যু ঘটে। কোভিড-১৯ মহামারিও পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। সূত্র : রয়টার্স, ইউরোনিউজ
জ/উ