
ভোরের নরম আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে বরগুনার তালতলী উপজেলার রাখাইন পল্লীগুলোতে শোনা যায় তাঁতের খটখট। কাঠের ঘরের ভেতর বসে নারীরা সুতোয় সুতোয় বুনে চলেছেন শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা ও শাল। এই খটখট শব্দ শুধু কাপড় নয়, বুনে যাচ্ছে একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনের গল্প।
১৩টি পল্লীতে ৫০০ পরিবার, জনসংখ্যা প্রায় ৩ হাজার
রাখাইন উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মিষ্টার মংচিন থান জানান, তালতলী উপজেলায় বর্তমানে ১৩টি রাখাইন পল্লীতে প্রায় ৫০০টি পরিবার বসবাস করছে। মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩ হাজার। এক সময় যেখানে প্রতিটি পরিবার তাঁতশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিল, সেখানে এখন হাতে গোনা মাত্র ১০টি পরিবার এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পে সক্রিয়।
তিনি বলেন, তাঁতশিল্প আমাদের পরিচয়, আমাদের ইতিহাস। এর টিকে থাকার জন্য বিশেষ সহযোগিতা প্রয়োজন। আমরা চাই নতুন প্রজন্মও এই শিল্পে যুক্ত হোক।
প্রজন্মের হাতে গড়া শিল্প : রাখাইন সম্প্রদায়ের জীবনধারার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে তাঁতশিল্প। পরিবারভিত্তিক এই শিল্পে নারীরাই মূল চালিকাশক্তি। মা থেকে মেয়ে, দাদি থেকে নাতনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শেখানো হয়েছে তাঁতের কাজ।
রাখাইন তাঁতে তৈরি শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা, শাল এবং অন্যান্য কাপড়ে ব্যবহার করা হয় লাল, নীল, হলুদ ও সবুজ রঙের সমন্বয়। জ্যামিতিক নকশায় ফুটে ওঠে প্রকৃতি, পাহাড় ও নদীর প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি কাপড় যেন একেকটি জীবন্ত শিল্পকর্ম, যা শুধু দৈনন্দিন ব্যবহারের নয়, রাখাইন সংস্কৃতির এক পরিচায়ক।
একজন প্রবীণ তাঁতশিল্পী বলেন, আমরা শৈশব থেকেই দেখেছি আমাদের মায়েরা এই তাঁত বুনে আসতেন। এখন আমাদের দায়িত্ব নতুন প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়া।
সময়ের স্রোতে সংকট : কিন্তু আধুনিক যন্ত্রের বিস্তার, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং বাজারজাতকরণের সীমাবদ্ধতা এই শিল্পকে সংকটে ফেলেছে। অনেক পরিবার আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে তাঁতশিল্প ছেড়ে দিয়েছে। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই এখন বিকল্প পেশায় ঝুঁকছেন।
তাঁতশিল্পীরা জানাচ্ছেন, এক শাড়ি বা গামছা তৈরি করতে কখনো এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগে। কিন্তু বাজারে সঠিক মূল্য না পাওয়ায় প্রচেষ্টা অনেকাংশে অর্থহীন হয়ে যায়। এছাড়া পর্যটক ও পাইকারি বাজারের সাথে সরাসরি সংযোগ না থাকায় উৎপাদিত পণ্য বাজারে পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়ছে।
নারী ও তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ : রাখাইন পল্লীতে এখনও নারী মূল শিল্পী। তারা প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁতে বসে বুনে চলেন। তরুণীরাও এই পেশায় যুক্ত হচ্ছে, তবে সংখ্যা কম। মিষ্টার মংচিন থান বলেন, তরুণ প্রজন্মকে উৎসাহিত করতে প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, অনলাইন বিপণন এবং স্থানীয় পর্যায়ে বাজার সংযোগ। এতে তাঁতশিল্পের টিকে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।
তালতলীর এক তরুণী তাঁতশিল্পী বলেন, আমি চাই আমার সন্তানরা দেখুক আমাদের শিল্প বাঁচে। এটা শুধু আমাদের জীবিকার উৎস নয়, আমাদের পরিচয়ও।
প্রশাসনের আশ্বাস : উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, রাখাইন তাঁতশিল্প বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমরা চাই এই শিল্প টিকে থাকুক। প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা এবং বাজারসংযোগ বাড়ানোর জন্য প্রশাসন কাজ করছে। সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা আমরা দেব।
তিনি আরও বলেন, তাঁতশিল্প টিকে থাকলে শুধু রাখাইন সম্প্রদায়ের জীবনধারা নয়, পুরো এলাকার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও রক্ষা পাবে।
সম্ভাবনা ও আশার আলো : সংকট থাকা সত্ত্বেও আশার আলো নিভে যায়নি। শীত ও উৎসব মৌসুমে রাখাইন কাপড়ের চাহিদা বাড়ে। পর্যটকদের আগ্রহও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কেউ কেউ অনলাইনে পণ্য বিক্রির উদ্যোগ নিচ্ছেন। পরিকল্পিত সহায়তা পেলে তাঁতশিল্প আবার প্রাণ ফিরে পাবে এটাই আশা রাখাইন সম্প্রদায়ের।
রাখাইন সম্প্রদায়ের তাঁতশিল্প তাই শুধু অতীত নয়, এটি চলমান ইতিহাস। প্রতিটি সুতো, প্রতিটি নকশা বয়ে নিয়ে যাচ্ছে নতুন প্রজন্মের কাছে শিল্পের স্বাদ, পরিচয় ও গৌরব।
জ/উ