প্রকাশ: রোববার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১:০৬ পিএম
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল কাদের মিয়া ছিলেন এক সাহসী ও দেশপ্রেমিক পুলিশ কর্মকর্তা। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই তিনি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মুক্তিকামী মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং নিজের জীবন উৎসর্গ করে স্বাধীনতার সংগ্রামে অমর হয়ে থাকেন।
শহীদ আব্দুল কাদের মিয়া ১৯৩০ সালের ১ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার জামিরতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা কসিম উদ্দিন আহমেদ ও মা আমেনা খাতুন। নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সৎ, নিষ্ঠাবান ও আদর্শচেতা একজন মানুষ। চাকরিসূত্রে ১৯৭১ সালে তিনি পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ থানায় ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর ২৭ মার্চ তিনি দেবীগঞ্জ থানায় বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং ঘোষণা দেন- “এখন থেকে দেবীগঞ্জ স্বাধীন।” এ সময় তিনি মুক্তিকামী যুবকদের প্রশিক্ষণ দেন এবং থানার অস্ত্রশস্ত্র তাদের হাতে তুলে দেন। নিজেও সক্রিয়ভাবে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেন। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অস্ত্র সংগ্রহ করতে তিনি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের হলদিবাড়ি যান।
১৯৭১ সালের ৩১ মে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের এক সংঘর্ষে আব্দুল কাদের মিয়া গুরুতর আহত হন। পরে আহত অবস্থায় তিনি নিজ বাড়িতে ফিরে যান। বিষয়টি জানতে পেরে পাকিস্তানপন্থী শান্তি কমিটির সদস্যরা সেনাবাহিনীকে খবর দেয়। এর পরদিন ১ জুন সকালে পাকিস্তানি সেনারা তাঁর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে। পরে দেবীগঞ্জের ব্রুজেরডাঙ্গা এলাকায় নিয়ে তাকে হত্যা করা হয় এবং লাশ মাটিচাপা দেওয়া হয়।
স্বাধীনতার পর ওই স্থান থেকে তাঁর জুতা, মোজা, আংটি ও কলম উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায় শহীদ আব্দুল কাদের মিয়ার কন্যা নূরজাহান বেগমের স্মৃতিকথা “আমার বাবা” গ্রন্থে।
স্বাধীনতার বহু বছর পর ১৯৯৯ সালে সরকার আব্দুল কাদের মিয়াকে শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয় এবং তাঁর স্মরণে দুই টাকার স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়াও দেবীগঞ্জে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পঞ্চগড় পুলিশ লাইনে একটি গ্রন্থাগার ও একটি সড়ক তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে।
প্রতিবছর স্বাধীনতা দিবস, বুদ্ধিজীবী দিবস ও বিজয় দিবসে তাঁর কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। শহীদ বুদ্ধিজীবী আব্দুল কাদের মিয়ার সাহসিকতা ও ত্যাগ আজও দেবীগঞ্জবাসীর জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে।