
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ইসলামী মূল্যবোধ ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এক অনন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান-শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। ২০০১ সালে যাত্রা শুরু করা এই ব্যাংক আজ দেশের অন্যতম সফল ইসলামী ব্যাংক হিসেবে নিজের অবস্থান দৃঢ় করেছে। ইসলামী অর্থনীতির ন্যায়নীতি, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং গ্রাহক আস্থার সমন্বয়ে ব্যাংকটি শুধু অর্থনৈতিক খাতেই নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রেও এক উজ্জ্বল উদাহরণ স্থাপন করেছে।
একুশ শতকের শুরুতে ইসলামী ব্যাংকিংকে আরও স্বচ্ছ, আধুনিক ও সময়োপযোগী রূপে উপস্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক। সীমিত শাখা নিয়ে শুরু করলেও এখন এর কার্যক্রম দেশের সর্বত্র বিস্তৃত-১৪৫টিরও বেশি শাখা, শতাধিক উপশাখা এবং শক্তিশালী এজেন্ট ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ব্যাংকটি মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিচ্ছে।
২০২৪ সালে ব্যাংকের মোট ব্যালান্স শিট সাইজ দাঁড়িয়েছে ৩৮৬,৮৫০ মিলিয়ন টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। মোট আমানত বেড়ে হয়েছে ২৮৫,৬৫৪ মিলিয়ন টাকা, আর মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২৬৮,৯৪৬ মিলিয়ন টাকায়। রপ্তানি ও আমদানি ব্যবসায়ও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে ব্যাংকটি, যা যথাক্রমে ৩৫ ও ৩৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘আমরা শুধু একটি ব্যাংক পরিচালনা করছি না, বরং এমন এক আর্থিক ব্যবস্থা তৈরি করছি যা ইসলামী মূল্যবোধের সঙ্গে আধুনিক আর্থিক প্রযুক্তিকে একত্র করে। গ্রাহক সন্তুষ্টিই আমাদের সবচেয়ে বড় পুঁজি।’
ডিজিটাল ব্যাংকিং যুগে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক প্রযুক্তিকে করেছে তাদের শক্তির মূলভিত্তি। ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন একাউন্ট খোলা, ই-কেওয়াইসি, কিউআর পেমেন্টসহ সব ধরনের ডিজিটাল সুবিধা এখন এক প্ল্যাটফর্মে। ডেটা সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তায় ব্যাংকটি ব্যবহার করছে সর্বাধুনিক এনক্রিপশন প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নেও ব্যাংকটির উদ্যোগ প্রশংসনীয়। ‘নারী উদ্যোক্তা বিনিয়োগ স্কিম’-এর মাধ্যমে শুধু অর্থায়ন নয়, প্রশিক্ষণ, ব্যবসা পরামর্শ ও মার্কেটিং সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি এসএমই খাতে মুরাবাহা ও মুশারাকা ভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যবস্থা দেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষিখাতেও ব্যাংকটির অবদান উল্লেখযোগ্য-ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য স্বল্পসুদে বিনিয়োগ সুবিধা এবং প্রবাসীদের জন্য দ্রুত, নিরাপদ রেমিট্যান্স সেবা চালু করেছে ব্যাংকটি।
শুধু ব্যবসা নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতার দিক থেকেও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক এক অনন্য দৃষ্টান্ত। শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দরিদ্রতা বিমোচন, ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণ এবং দুর্যোগকবলিত এলাকায় ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালনা করছে ব্যাংকটি। করোনাকালে হাসপাতাল সহায়তা ও চিকিৎসা সামগ্রী সরবরাহে ব্যাংকটির ভূমিকা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।
দেশি-বিদেশি স্বীকৃতিতেও সমৃদ্ধ শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশংসাপত্র, আইসিএবি কর্পোরেট গভর্ন্যান্স অ্যাওয়ার্ড এবং গ্লোবাল ফাইন্যান্স ও এশিয়ান ব্যাংকিং অ্যাওয়ার্ডের মতো সম্মাননা অর্জন করেছে ব্যাংকটি।
ইসলামী ব্যাংকিং খাতে প্রতিযোগিতা বাড়লেও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক নিজেকে আলাদা করেছে স্বচ্ছ লেনদেন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা এবং গ্রাহককেন্দ্রিক সেবার মাধ্যমে। মুদারাবা, মুশারাকা ও ইজারাহ ভিত্তিক ইসলামী বিনিয়োগ পদ্ধতিই এর বিশেষ পরিচয় তৈরি করেছে।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বৈশ্বিক মন্দার সময়েও ব্যাংকটি দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। বিনিয়োগ ঝুঁকি বিশ্লেষণ, অভ্যন্তরীণ অডিট ও মানবসম্পদ উন্নয়নে জোর দিয়ে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য সম্পূর্ণ ডিজিটাল ইসলামী ব্যাংক তৈরি করা-যেখানে গ্রাহক, উদ্যোক্তা, কৃষক ও প্রবাসী সবাই প্রযুক্তির মাধ্যমে সমানভাবে সেবা পাবেন। শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক হতে চায় একটি বিশ্বাসযোগ্য ও মানবিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান।’
দুই দশকের যাত্রায় শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক প্রমাণ করেছে-ইসলামী নীতি মেনে চলেও আধুনিক ব্যাংকিং সম্ভব, এবং সেই ব্যাংকিংই টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। ইসলামী মূল্যবোধ, প্রযুক্তি ও গ্রাহকসেবার সমন্বয়ে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক আজ সত্যিই আধুনিক ইসলামী ব্যাংকিংয়ের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
জ/উ