
দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে আধুনিকীকরণ, ডিজিটাল সেবা এবং গ্রাহক-অভিজ্ঞতায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে রূপালী ব্যাংক। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং, ঋণ পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি—এই তিনটি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে ব্যাংকটি এগোচ্ছে ‘পরিবর্তনের পথে’।
নেতৃত্বের নবদিগন্ত
২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে দায়িত্ব গ্রহণ করা ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম ব্যাংকটির রূপান্তর প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘২০২৫ সালকে আমরা ঘোষণা করেছি ‘‘ঋণডুবি উদ্ধার বছর’’ হিসেবে। আমাদের লক্ষ্য—প্রত্যেক নাগরিকের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং রূপালী ব্যাংককে ডিজিটাল উৎকর্ষের শীর্ষে নিয়ে যাওয়া।”’
তার নেতৃত্বে ব্যাংকটি একদিকে যেমন আর্থিক পুনর্গঠনে মনোযোগ দিচ্ছে, অন্যদিকে ‘ডিজিটাল ব্যাংকিং’ ও ‘ফিনান্সিয়াল ইনক্লুশন’-এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের ব্যাংকিং সংস্কৃতি গড়ে তুলছে।
ডিজিটাল বিপ্লবের নাম: রূপালী ক্যাশ
রূপালী ব্যাংকের ডিজিটাল যাত্রায় সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগ হচ্ছে ‘রূপালী ক্যাশ’। এটি ব্যাংকটির নিজস্ব মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), যা সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রথম সারির ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গ্রাহকরা এখন ঘরে বসেই ই-কেওয়াইসি ভিত্তিক অ্যাকাউন্ট খুলে টাকা পাঠানো, বিল পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জ, মার্চেন্ট পেমেন্ট, সরকারি ভাতা ও বেতন গ্রহণ—সব কিছুই করতে পারছেন একটি অ্যাপের মাধ্যমে। ফলে শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গায় ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে গেছে, বাস্তবায়ন হয়েছে ‘হাতের মুঠোয় ব্যাংকিং’ ধারণা।
ব্যাংকের তথ্যমতে, ‘রূপালী ক্যাশ’ চালুর প্রথম ছয় মাসেই গ্রাহকসংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ এবং দৈনিক লেনদেন ১৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
সাইবার সুরক্ষা ও বিশ্বাসের কাঠামো
রূপালী ক্যাশ-এর প্রতিটি লেনদেন ব্যাংক-গ্রেড এনক্রিপশন ও উন্নত সাইবার সিকিউরিটি প্রোটোকল দ্বারা সুরক্ষিত। গ্রাহকরা পাচ্ছেন তাৎক্ষণিক লেনদেন নোটিফিকেশন, ২৪/৭ হেল্পলাইন ও ওটিপি-ভিত্তিক নিরাপত্তা যাচাই। ব্যাংকের নিজস্ব সাইবার মনিটরিং সেল সার্বক্ষণিকভাবে প্রতারণা ও অননুমোদিত অ্যাক্সেস প্রতিরোধে কাজ করছে।
ঋণ পুনরুদ্ধার ও আর্থিক স্থিতি
২০২৪ সালে রূপালী ব্যাংক বড় একটি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। ওই বছর ব্যাংকের মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ৮২ শতাংশ কমে যায় এবং ১৫,৩৭৫ কোটি টাকা প্রভিশন ঘাটতি দেখা দেয়।
এই অবস্থায় ব্যাংকটি গঠন করে একটি বিশেষ ‘ঋণ পুনরুদ্ধার টাস্কফোর্স’, যার লক্ষ্য প্রায় ২২,০০০ কোটি টাকা পুনরুদ্ধার করা। ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যে প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকা আদায় করা সম্ভব হয়েছে এবং বাকি অংশের জন্য চলছে আইনি ও পুনঃতফসিল প্রক্রিয়া। এই উদ্যোগ শুধু ব্যাংকের আর্থিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনবে না, বরং রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য একটি কার্যকর রিস্ক ম্যানেজমেন্ট মডেল হিসেবেও দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।