
মাদক মামলার তদন্তে বাণিজ্য করার অভিযোগে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও বিভিন্ন অনিয়মের নিয়ামক মেহেরপুর জেলা মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ইন্সপেক্টর বিদ্যুৎ বিহারী নাথ। তিনি নড়াইল জেলা, কক্সবাজারের টেকনাফ ও খাগড়াছড়ি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে কর্মরত থাকাকালে এমন সব অভিযোগ পাওয়া গেছে তার বিরুদ্ধে।
জানা যায়, বিদ্যুৎ বিহারী নাথ গত ১১ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি থেকে বদলী হয়ে মেহেরপুর জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কার্যালয়ে আসেন। এরপরই কয়েকটি বিতর্কিত অভিযান চালান ও এক ব্যক্তির ব্যাগ তল্লাশির নামে সেটি সবার চোখের আড়ালে নিয়ে যান। এমন ঘটনা ঘটানোর পেছনে তার মাসোহারা আদায়ের ছক ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের মন্তব্যে জানা যায়।
অপরদিকে, গত ২০২১ সালের ২৫ আগস্ট কক্সবাজারের টেকনাফের হাবিবছড়া দক্ষিণ ঘাটে অভিযান চালিয়ে একটি সাম্পান নৌকাসহ সাড়ে ৭ কোটি টাকা সমমূল্যের ২ লাখ ৫০ হাজার ইয়াবার একটি চালান জব্দ করেছিল তৎকালীন টেকনাফ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা বিদ্যুৎ বিহারী নাথ। পরের দিন ২৬ আগস্ট টেকনাফ মডেল থানায় আটজনকে পলাতক আসামি দেখিয়ে মামলা করেন অধিপ্তরের সহকারী পরিচালক সিরাজুল মোস্তফা। আসামিরা হলো, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের হাবিরছড়া গ্রামের আমির হামজার ছেলে মোহাম্মদ হারুন (২৮), এক নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য মো. রশিদ (৩৫)। ওই মামলার তদন্তের দায়িত্ব পান অধিদপ্তরের তৎকালীন টেকনাফ বিশেষ জোনের পরিদর্শক বিদ্যুৎ বিহারী নাথ।
ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিদ্যুৎ বিহারী নাথের তদন্তে ব্যর্থতা, দায়িত্ব পালনে অবহেলা, অসৎ উদ্দেশ্যে সময়ক্ষেপণের অভিযোগ এনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার আদেশ দিয়েছেন কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (আমলি আদালত, টেকনাফ) আসাদ উদ্দিন মো. আসিফ। তদন্তকারী কর্মকর্তা বিদ্যুৎ বিহারী নাথ ইচ্ছাকৃতভাবে অসৎ উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেননি। তাতে ন্যায়বিচার পরাহত এবং বিচার বিলম্বিত হয়েছে। সার্বিক বিষয় বিশ্লেষণ করে তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন আদালত।
এদিকে ওই অভিযানের সময় মাদক ও অস্ত্র ফেলে আসামিদের পালিয়ে যেতে দেখার বিষয়টি এজাহারে উল্লেখ থাকার পরও নিজের তদন্তে ওই দুই আসামির দায়মুক্তি ঘিরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। শুধু এ ঘটনা নয়, তার বিরুদ্ধ অভিযানের নামে টেকনাফের বিভিন্ন এলাকার নিরীহ মানুষ ধরে এনে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে কন্ট্রাক্ট করে সাজানো অভিযান ও মামলা বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘদিনের। বিষয়টি স্বীকারও করেছেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনেকে।
আরও জানা যায়, ২০২২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ইন্সপেক্টর বিদ্যুৎ বিহারী নাথের নেতৃত্বে একটি অভিযানে টেকনাফের একটি বাড়ি থেকে ৪টি বিদেশি অস্ত্র, ১৪১ রাউন্ড গুলি, ৩টি ম্যাগাজিন, ৫৩ হাজার ইয়াবা এবং ৭০০ গ্রাম হেরোইনসদৃশ নতুন মাদক উদ্ধার করেন। ওই সময় কাউকে আটক করতে না পারলেও পালিয়ে যেতে দেখেন। এ ঘটনায় ২৫ সেপ্টেম্বরে টেকনাফ থানায় পরিদর্শক বিদ্যুৎ বিহারী নাথের করা মামলায় ১নং আসামি করা হয় টেকনাফ সদর ইউপির গোদার বিলের আবু সৈয়দের ছেলে আবদুল্লাহ এবং ২নং আসামি একই ইউপির উত্তর লম্বরির হোছন আহমদের ছেলে আবদুল কাদের। অন্য আসামিরা হলেন পশ্চিম গোদার বিলের ইমাম হোসেনের ছেলে মোহাম্মদ সাজেদ প্রকাশ শাহেদ, ইমাম হোসেনের ছেলে মোহাম্মদ সালেম প্রকাশ শাহ আলম, দক্ষিণ লেঙ্গুর বিলের হোসাইন আহমদের ছেলে মোহাম্মদ সাদেক প্রকাশ সাদ্দাম, বশির আহমদের ছেলে আনোয়ার এবং গোদার বিলের কালা মিয়ার ছেলে মো. কাসিম (জিআর মামলা নং- ৬৯০)। তদন্ত করেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর টেকনাফ বিশেষ জোনের উপপরিদর্শক (এসআই) তুন্ত মনি চাকমা। অস্ত্র আইনে করা মামলাটি টেকনাফ থানার এক এসআই তদন্ত করেন। দেড় মাসের মাথায় ১০ নভেম্বর মাদক মামলাটির অভিযোগপত্র (চার্জশিট) আদালতে দাখিল করা হয়। যেখানে এজাহারে অভিযুক্ত ১ নম্বর আসামি আবদুল্লাহ এবং ২ নম্বর আসামি আবদুল কাদেরকে অব্যাহতি দেয়া হয়। এতে অভিযোগ পাওয়া যায় যে, কোটি টাকার বিনিময়ে ওই দুই চিহ্নিত ইয়াবা কারবারিকে বাদ দিয়েই দ্রæত সময়ের মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সংশ্লিষ্টরা। একইভাবে এক জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে সাজানো অভিযান চালানোর অভিযোগ রয়েছে ইন্সপেক্টর বিদ্যুৎ বিহারী নাথের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় সূত্র থেকে জানা যায়, চার্জশিট থেকে বাদ দিতে আসামি আব্দুল্লাহর বাবা আবু ছৈয়দ মেম্বারের কাছ থেকে ৭০ লাখ টাকা নিয়েছিলেন বিদ্যুৎ বিহারী। এর আগে সাজানো অভিযান পরিচালনা করতে একজন মাদকের গডফাদার ও চেয়ারম্যানের কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা এবং অস্ত্র ও মাদকগুলো নিয়েছিলেন। যাদের মাদক মামলায় ফাঁসানোর জন্য এবা চুক্তি হয়েছিল টাকার বিনিময়ে, তারা বাদ গেলেও নিরীহ ইমাম হোসেনসহ অন্যদের ঠিকই ফাঁসিয়েছিলেন তিনি।
অভিযোগ প্রসঙ্গে ইন্সপেক্টর বিদ্যুৎ বিহারী নাথের সাথে যোগযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কি সব অভিযোগ করছেন। এগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। সবই মনগড়া কথা ছাড়া কিছু নয়। আপনি যা লেখার লিখে দিন বলে মোবাইলের কল কেটে দেন।