
মানব ইতিহাসে অনেক জ্ঞানী, দার্শনিক ও সংস্কারক এসেছেন। তারা কেউ জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়নে, কেউ ন্যায়নীতির প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখেছেন। তবে সবার ঊর্ধ্বে যার নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। মরুর বুকে বিশ্বশান্তির দূত হয়ে তিনি এসেছিলেন। তার দয়া-করুণা ছিল সীমাহীন। এমনকি যারা তাকে অস্বীকার করত কিংবা তার সঙ্গে শত্রুতা করত, তাদের প্রতিও তিনি দয়া ও মমতা প্রদর্শন করেছেন।
তায়েফবাসী তাকে অপমান করে রক্তাক্ত করে দিয়েছিল, তবুও তিনি তাদের ধ্বংস কামনা করেননি। বরং প্রার্থনা করেছিলেন যেন তাদের বংশধররা ইমান আনতে পারে। যারা তাকে ও তার সাথীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিল, মক্কার বিজয়ের দিনে তিনি সেটার প্রতিশোধও নেননি, বরং সাধারণ ঘোষণা করেছিলেন। এত বড় হৃদয়ের দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছি।’ (সুরা আম্বিয়া ১০৭)
নবীজির জন্ম ও শৈশব : হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়াল মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মবর্ষকে বলা হয় আমুল ফিল তথা হাতির বছর। তার জন্মের আগেই পিতা আবদুল্লাহ মৃত্যুবরণ করেন এবং মাত্র ছয় বছর বয়সে মাতা আমেনা ইন্তেকাল করেন। ফলে তিনি এতিম অবস্থায় বড় হতে থাকেন। দাদা আবদুল মুত্তালিব এবং পরে চাচা আবু তালিব তার দায়িত্ব নেন। শৈশবেই তিনি সততা, বিশ্বস্ততা ও নম্রতায় সবার প্রিয় হয়ে ওঠেন। মানুষ তাকে আল-আমিন (বিশ্বস্ত) নামে ডাকতে শুরু করে।
নবুয়তের সূচনা : নবীজির ৪০ বছর বয়সে হেরা গুহায় ইবাদতের সময় মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে হজরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম প্রথম ওহি নিয়ে আসেন। তখন আল্লাহ বলেন, ‘পড়–ন, আপনার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা আলাক ১) এর মাধ্যমে তিনি নবুয়তের মহান দায়িত্ব লাভ করেন। তিনি মানুষকে আহ্বান জানান, ‘হে মানবজাতি! তোমরা বলো, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তবেই সফল হবে।’
মক্কায় দাওয়াত ও নির্যাতন : নবীজি (সা.) প্রথমে গোপনে এবং পরে প্রকাশ্যে মানুষকে ইসলাম গ্রহণে আহ্বান জানান। কিন্তু কুরাইশরা তীব্র বিরোধিতা শুরু করে। তাকে উপহাস, গালি ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়। সাহাবিরাও অনেক নির্যাতন ভোগ করেন। কিন্তু নবীজি (সা.) ধৈর্য ধরে দাওয়াত চালিয়ে যান। তার প্রতি শত্রুতা এতটাই বেড়ে যায় যে তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়। মহান আল্লাহর নির্দেশে তিনি প্রিয় সাহাবিদের সঙ্গে মদিনায় হিজরত করেন।
মদিনায় ইসলামি সমাজ গঠন : ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় হিজরত করে নবীজি (সা.) নতুন ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মসজিদে নববী নির্মাণ করেন, মুসলিমদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন এবং মদিনার মুসলিম-ইহুদি সম্পর্কের জন্য সংবিধান প্রণয়ন করেন। এভাবে তিনি শান্তি, সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলেন।
নবীজির চরিত্র ও আদর্শ : পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ নবীজি (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সুরা কলম ৪) তার চরিত্রে যেসব গুণাবলি ছিল সেগুলোর কয়েকটি উল্লেখ করা হলো।
দয়া ও সহানুভূতি : এতিম, গরিব, দাস-দাসী সবার জন্য তিনি ছিলেন দয়ার প্রতীক।
সাহস ও ধৈর্য : কঠিন সময়ে তিনি ধৈর্য ধরে সংগ্রাম করেছেন।
নারীর সম্মান : তিনি নারীর মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন, তাদের উত্তরাধিকারের অধিকার দেন।
নবীজির যুদ্ধনীতি : প্রয়োজনে তিনি প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ করেছেন। তবে তার নির্দেশ ছিল, নারী, শিশু, বৃদ্ধ, নিরীহ মানুষ হত্যা করা যাবে না, গাছ কাটা, ফসল নষ্ট করা যাবে না। এভাবে তিনি মানবিক যুদ্ধনীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
কোরআন নবীজির সর্বশ্রেষ্ঠ মুজিজা : আমাদের নবীজি (সা.)-এর সর্বশ্রেষ্ঠ মুজিজা হলো আল-কোরআন। এটি মানবজাতির পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। কোরআন মানুষকে ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির পথ দেখায়। তিনি নিজ জীবনে কোরআনের পূর্ণ প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন।
বিদায় হজ ও ওফাত : হিজরি ১০ সালে বিদায় হজের সময় তিনি একটি মহৎ খুতবা প্রদান করেন। সেখানে তিনি ঘোষণা করেন, মুসলমানরা একে অপরের ভাই। নারীদের প্রতি সদয় হও। সুদ ও রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব চিরতরে নিষিদ্ধ। জীবন, সম্পদ ও ইজ্জত পরস্পরের কাছে পবিত্র। এর অল্পদিন পর ৬৩ বছর বয়সে ১১ হিজরি রবিউল আউয়ালে আমাদের নবীজি (সা.) ইন্তেকাল করেন।
আদর্শ জীবনদর্শন : আমাদের নবীজি (সা.) শুধু একজন ধর্মীয় নেতা নন, তিনি একজন মহান মানবতাবাদী, সংস্কারক ও বিশ্বশান্তির দূত। তার শিক্ষা অনুসরণ করলেই পৃথিবীতে শান্তি, ন্যায় ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা সম্ভব। তিনি আমাদের জন্য আদর্শ জীবনদর্শন রেখে গেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহর মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহজাব ২১)
অতএব প্রতিটি মুমিনের উচিত নবীজি (সা.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে তা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করা। তবেই দুনিয়া ও আখেরাতে মুক্তি লাভ করা সম্ভব।
জ/উ