
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্ত করতে কিছু সুযোগ তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট করা উচিত। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য চাকরি দেয়াকে বোঝা নয় বরং তাদের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাদের প্রতিভা আছে সেই প্রতিভাকে বিকশিত করতে প্রয়োজন পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রের সহযোগিতা। দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ সুবিধা ও অবকাঠামো আয়োজনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বর্তমানে সর্বত্রই প্রতিবন্ধীদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। যতটা সহজ মনে হচ্ছে ততটা সহজ এখনো হয়নি বিশেষ করে প্রতিবন্ধী নারীদের ক্ষেত্রে। ফলে তাদের অধিকারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে অজ্ঞাত কারণে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। একাধিক কমিশনের কাছে দাবি রাখতে হবে। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার সংক্রান্ত কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে প্রতিবন্ধীদের নির্বিঘ্নে ভোট দেয়ার বিষয়ে সুপারিশ এখন সময়ের দাবি। যা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, শারীরিক প্রতিবন্ধী ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী প্রত্যেকের জন্য সুবিধাজনক উপায়ে ভোট গ্রহণে সহায়ক হয়। সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত একটি কমিটি করা হয়েছে। এ কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে প্রতিবন্ধীদের অধিকার সুরক্ষার ব্যাপারে সুপারিশ করতে হবে। প্রতিবন্ধীদের চাকরি নিশ্চিতের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করতে হবে। সরকার চাইলেই চাকরি দিতে পারে। বিচারব্যবস্থায় যাবতীয় ক্ষেত্রে বাক্প্রতিবন্ধী মানুষের বক্তব্য যেন আদালতের বিচারক গ্রহণ করতে আইনগতভাবে বাধ্য হন। তাদের সাক্ষী হিসেবে গ্রহণের ক্ষেত্রে আদালতে ইশারা ভাষার প্রচলন করতে হবে।
সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান উভয়ের মধ্যে দায়বদ্ধতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দায়বদ্ধতা ছাড়া সবচেয়ে ভালো নীতিও সফল হতে পারে না। রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক বড় ও সুপরিচিত কোম্পানি রয়েছে। এসব কোম্পানি তাদের কর্মক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিবন্ধীদের জন্য কর্মসংস্থানের অনুক‚ল পরিবেশ তৈরি করা গেলে, তারা তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পাবে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে সেগুলো পর্যালোচনা করা এবং বিদ্যমান সুযোগ ও সম্ভাব্য সমাধানগুলো নিয়ে আলোচনা করা। ২০১৩ সালের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা আইন বাস্তবায়নের জন্য একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হলেও মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়ের অভাব এবং অন্য অংশীদারদের সঙ্গে অর্থবহ সম্পৃক্ততার অভাবে এটি বাস্তবায়িত হয়নি।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মূলধারার দক্ষতা উন্নয়নপ্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, কাজের ক্ষেত্রে স্থানান্তর, কর্মস্থলে অন্তর্ভুক্তি ও স্থায়িত্ব এবং অর্জিত দক্ষতা ও কর্মসংস্থানকে সহায়তা করবে।
সালমা মাহবুব (সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্য চেঞ্জ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাস (বি-স্ক্যান) বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনের পর প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়গুলো গুরুত্ব দেয়া দরকার ছিল। উপদেষ্টামন্ডলীতে প্রতিবন্ধীদের একজন প্রতিনিধিকে যুক্ত করা, সেটি সম্ভব না হলে অন্তত একজন সহযোগী হিসেবে যেন নেয়া হয়।
ড. মোহাম্মদ সোহরাব হোসেন, নির্বাহী পরিচালক, পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র (সিআরপি) বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ ও পুনর্বাসনের পর তাঁদের কাজের ব্যবস্থা না করা হলে তারা পিছিয়ে থাকবে। তাঁদের স্বনির্ভর করা জরুরি। আমাদের দেশের চাহিদা বিবেচনায় পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ একান্ত প্রয়োজন। চলতি সপ্তাহে আমাদের একটি জব সিলেকশন প্রোগ্রাম রয়েছে, যেখানে পোশাক খাতের ৪০টি প্রতিষ্ঠান সরাসরি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্য থেকে নির্বাচন করবে কারা কারা চাকরি করবেন। চাকরির সুযোগ তৈরি করে দেয়া এবং আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাই প্রতিবন্ধীদের প্রকৃত পুনর্বাসন হবে। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ ডেস্ক করার ব্যবস্থা করা গেলে সেখানে কাজের পরিধি বাড়বে।
ডব্লিউডিডিএফের নির্বাহী পরিচালক আশাফুন্নাহার মিষ্টি বলেন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় কোনো কারণে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষাটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারণে ছাড়তে চাই না। যুবদের জন্য কোনো কাজ করতে চান না। নারীদের জন্য তো নয়। তাদের নেতিবাচক মনোভাবেই প্রতিবন্ধী নারীরা অর্ন্তভুক্ত হতে পারছে না।
নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাসিমুন আরা হক বলেন, কর্মস্থলে এখনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চাহিদা অনুযায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়নি। সরকারিভাবে বিসিকের পাশাপাশি বেসরকারি খাত বিজিএমইএ এবং বিকেএমইতেও এ ধরনের কার্যক্রম থাকা জরুরি। বর্তমানে দেশে যে সংস্কার প্রক্রিয়া চলমান, আমরা আশা করি এ প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার, সুরক্ষা ও তাদের কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ের যেকোনো কাজে তাদের যুক্ত করতে হবে।