রূপায়ণ স্বপ্ন নিলয়ের অবৈধ বাণিজ্যে অগ্নিনিরাপত্তার ঝুঁকি
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, ৮:১৯ পিএম

রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী রোডের রূপায়ণ স্বপ্ন নিলয় প্রকল্পটি ছিল স্বপ্নের আবাসন কিন্তু বর্তমানে তা পরিণত হয়েছে আতঙ্কের আবাসনে। আবাসিক প্রকল্পের কমিউনিটি ভবনকে বেআইনিভাবে ব্যবহার করে সেখানে একাধিক রেস্টুরেন্ট ও সুপারশপ চালু করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। এগুলো চালুর আগে তাদের মতামত নেয়া তো দূরের কথা, বরং রাজউকের অনুমোদিত নকশা সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ফ্ল্যাট মালিক ও বাসিন্দারা। এছাড়াও চুক্তি অনুযায়ী কমিউনিটি ভবন ব্যবহৃত হওয়ার কথা ছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য বা আবাসিক উদ্দেশ্যে। কিন্তু এখন সেখানে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে গ্রাহক ও ডেলিভারি কর্মীদের ভিড়ের শব্দদূষণ, যা চরম নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করছে বলে অভিযোগ করেন ফ্ল্যাট মালিকরা।

স্বপ্ন নিলয় প্রকল্পের চারটি ভবনে দুই’শ বেশি ফ্ল্যাটের মালিকরা জানান, তারা ফ্ল্যাট কেনার সময় রূপায়ণ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লিখিতভাবে প্রতিশ্রুতি পান যে কমিউনিটি ভবন শুধুমাত্র বাসিন্দাদের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হবে। তবে বাস্তবে তা হয়নি। আমরা বিশ্বাস করে ফ্ল্যাট কিনেছিলাম। এখন দেখি আমাদের থাকার পরিবেশটাই নষ্ট হয়ে গেছে। চারতলার কমিউনিটি স্পেসে সুপারশপ, রেস্টুরেন্ট চালু করে দিয়েছে, অথচ রাজউকের কোনো অনুমোদন নেই বা চুক্তির কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি। এছাড়াও এসব অবৈধ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। ভবনটিতে নেই পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, নেই কোনো জরুরি নির্গমন পথ বা নিয়মিত সিকিউরিটি চেকও নেই।
এদিকে আরও অভিযোগ উঠেছে, বাসিন্দারা একাধিকবার রূপায়ণ কর্তৃপক্ষকে এসব সমস্যার কথা লিখিতভাবে অবহিত করলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বরং কোম্পানির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে পরিস্থিতি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এ ধরণের বাণিজ্যিক স্থাপনা চালু করতে রাজউকের কোনো অনুমোদনও নেয়া হয়নি, যা রাজউকও জানে। স্থানীয় প্রশাসনের গাফিলতি ও প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এই অবৈধ কার্যক্রম বহাল রয়েছে। 

বাসিন্দারা বলছেন, কমিউনিটি ভবনে ফায়ার হাইড্রেন্ট ও পানির রিজার্ভার নেই। ওয়াসার সরবরাহ লাইনে গেটভাল্ব বন্ধ থাকায় অগ্নিকাণ্ড ঘটলে নেভাতে পানি সঙ্কট দেখা দেবে। এ ছাড়াও গ্যাস সিলিন্ডারের অবৈধ মজুদের তথ্য নেই। কমপ্লেক্সে গ্রিন লাউঞ্জ রেস্টুরেন্টে গ্যাস চেম্বার না থাকায় কিচেন ও বেজমেন্টে সিলিন্ডার মজুদ করে রাখা হয়, যা বিস্ফোরণের ঝুঁঁকি বাড়াচ্ছে। এ দিকে কমপ্লেক্সের প্রায় ১১০ জন ফ্লাট মালিককে এখনো ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন করে দেয়নি রূপায়ণ হাউজিং। রেজিস্ট্রেশন বাবদ ১৫ লাখ টাকা লাগার কথা থাকলেও এখন ৪০-৫৫ লাখ টাকা চাইছে রূপায়ণ কর্তৃপক্ষ।

জানা যায় ‘রূপায়ণ স্বপ্ন নিলয় ফ্ল্যাট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’ যা ওই আবাসিক প্রকল্পের ফ্ল্যাটের মালিকদের সমিতি, যথাক্রমে রাজউক, ওয়াসা, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস, রমনা থানা ও পরিবেশ অধিদফতরে অভিযোগ করেও কোনো সুরাহা পাননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছিুক এক ফ্ল্যাট মালিক জানান ‘আমরা ১৩০ জন ক্রেতা রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট হতে মোট ১৩০টি ফ্ল্যাট ক্রয় করি এবং রূপায়ণ হাউজিং কর্তৃপক্ষ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সালে রূপায়ণ স্বপ্ন নিলয় ফ্ল্যাট মালিকদের কাছে হস্তান্তর করে। রূপায়ণ স্বপ্ন নিলয় আবাসিক কমপ্লেক্সটি একটি কন্ডোমোনিয়াম প্রকল্প এবং এটি রাজউক কর্তৃক অনুমোদিত চারটি আবাসিক ভবন এবং তিনতলাবিশিষ্ট একটি কমিউনিটি ভবন রয়েছে।

ফ্যাসিস্ট আমলের বিচারপতির কীর্তি: ওকালতির নামে টাকা নিয়ে নয়-ছয়

এ প্রসঙ্গে ফ্ল্যাট মালিক সমিতির এক নেতা বলেন, আমরা রাজউককে অভিযোগ করেছি। ডিপার্টমেন্ট অব ফায়ার সার্ভিসকেও জানিয়েছি, কিন্তু কেউ কানে নেয়নি। যদি বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তার দায় কে নেবে?’ এখানে বাসিন্দারা এখন আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তারা চান অবিলম্বে এই অবৈধ বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করা হোক, অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক এবং চুক্তির শর্তানুযায়ী কমিউনিটি ভবন শুধু সামাজিক ও বাসিন্দাদের কাজে ব্যবহারের নিশ্চয়তা দেয়া হোক।

স্বপ্ন নিলয় ফ্লাট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক সদস্য জানান, কিছুদিন পূর্বে বেইলি রোডে কাচ্চি ভাই রেস্টুরেন্টে ভয়াবহ অগ্নি দুর্ঘটনায় প্রায় ৪৬ জন মারা যাওয়ার পর থেকে আমরা আরো বেশি আতঙ্কিত। একই এলাকায় সিরাজ ক্যাপিটালেও কয়েকদিন আগেই ভয়াবহ অগ্নিকাÐে ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়।

রূপসা সেতুর নিচ থেকে সাংবাদিকের লাশ উদ্ধার

সরেজমিনে দেখা যায়, কমিউনিটি ভবনের ১ম তলায় হেয়ার ড্রেসার/বিউটি সেলুন এবং ভিডিও শপ, ২য় তলায় পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আলাদা ২টি জিমনেসিয়াম, ৩য় তলায় কমিউনিটি স্পেসসহ অ্যাসোসিয়েশনের কমন সার্ভিসসমূহ রাজউক কর্তৃক অনুমোদিত নকশা মোতাবেক থাকার কথা, কিন্তু বাস্তবে এ ভবনে রেস্টুরেন্ট সুপারশপ ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে, যা জানমালের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। দেখা যায় গ্রিন লাউন্স রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষের নিজস্ব কোনো গ্যাস চেম্বার না থাকায় তারা কিচেনের মধ্যে সিলিন্ডার রেখে রান্নার কার্যক্রম পরিচালনা করে, এ ছাড়াও বেইজমেন্টের সিঁড়িতে প্রায় ১০-১৫টি গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার রিজার্ভ করে রেখে দিয়েছে।

এদিকে গত ৯ ফেব্রুয়ারি রাজউকের অভিযানে উক্ত আবাসিক ভবনে অবৈধ স্থাপনার কারণে রূপায়ণকে তিন লাখ টাকা জরিমানা ও অবৈধ অংশ অপসারণের আদেশ দেয়া হলেও এখনো এতে কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। কমিউনিটি ভবনের ছাদে সুইমিংপুলের পাশে ১৫ ফুট উচ্চতার অবৈধ স্টিল স্ট্রাকচার যোগ করে রেস্টুরেন্ট সম্প্রসারণ করা হয়েছে, যা ১৩০ ফ্ল্যাট মালিকদের সাথে হওয়া চুক্তির সম্পূর্ণ বরখেলাপ।
রাজউক সূত্র থেকে জানা যায়, রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেডকে কমিউনিটি ভবন বাসিন্দাদের হাতে হস্তান্তর না করে অবৈধভাবে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বিক্রির অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে। ওই আবাসিক ভবনে অবৈধ স্থাপনার কারণে রূপায়ণকে তিন লাখ টাকা জরিমানা ও অবৈধ অংশ অপসারণের আদেশ দেয়া হয়েছিল।

রাজধানীতে মার্কেট নির্মাণ করে জমির মালিকের প্রতারণায় নিঃস্ব এক ভুক্তভোগী

এ প্রসঙ্গে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের মহাপরিচালক বলেন, তারা অভিযোগ পেয়েছেন। যতদ্রুত সম্ভব তদন্ত করে প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। এদিকে ভবনগুলোর বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বলেও জানান অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা।

অভিযোগ প্রসঙ্গে রূপায়ণ গ্রপের চিফ অপারেটিং অফিসার সাইফুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি তাদের গ্রুপের মিডিয়া বিভাগে যোগাযোগের কথা বলেন।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


Also News   Subject:  অপরাধ   রাজউক   রূপায়ণ স্বপ্ন নিলয় প্রকল্প   কমিউনিটি ভবন   রেস্টুরেন্ট   সুপারশপ  







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft