প্রকাশ: রোববার, ২৪ আগস্ট, ২০২৫, ১০:৩২ এএম

কক্সবাজার শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে রামু। এ উপজেলার লট উখিয়ারঘোনায় গেলে চোখে পড়ে একটি প্যাগোডা। ৩০০ ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় এর অবস্থান। নাম লাওয়ে প্যাগোডা (জাদি)। গবেষকদের দাবি, এর বয়স প্রায় ৩১৫ বছর।
কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পার হয়ে রামু চৌমুহনী থেকে আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে এ প্যাগোডায় যেতে হয়। এটি মূলত বৌদ্ধ সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী সমাধি মন্দির। স্থানীয়রা জানান, উপজেলার সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ে অবস্থানের কারণে এ প্যাগোডা থেকে দেখা মেলে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, বাঁকখালী নদী এবং চারপাশের নৈসর্গিক সৌন্দর্য।
যা রয়েছে প্যাগোডায়
লাওয়ে প্যাগোডাটি বর্গাকার ভূমি পরিকল্পনায় নির্মিত। এর প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য ১০.৫৭ মিটার। নিচের অংশে রয়েছে একটি নিরেট এবং উঁচু বর্গাকার ভিত। উঁচু ভিতটির চারপাশের প্রতিটি বাহুতে জ্যামিতি নকশাযুক্ত প্যানেল। উঁচু বর্গাকার ভিতটির ওপরে রয়েছে একাধিক ধাপবিশিষ্ট বহুভুজের চত্বর। এ চত্বরের ওপরে রয়েছে ঘণ্টা আকৃতির নকশা। নকশার ওপরে রয়েছে উল্টানো বাটি নকশা। ওপরে রয়েছে পদ্ম পাপড়ি নকশা, এর ওপরে রয়েছে কলার কুঁড়ি আকৃতির নকশা। তার ওপরে মুকুট, কারুকার্যময় টোপরের চারপাশ ঘিরে ঝুলে আছে ছোট ছোট পিতলের ঘণ্টা। ঘণ্টাগুলো বাতাসে টুং টাং আওয়াজ করে। বর্তমানে ঘণ্টাগুলোর অধিকাংশ নষ্ট। দক্ষিণ-পশ্চিম কোনা দিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে সরু পথ দিয়ে প্যাগোডায় উঠতে হয়।
যেভাবে নির্মিত হয়েছে
বাংলা একাডেমির ‘বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা, কক্সবাজার’-এর তথ্যমতে, আনুমানিক ১৭১০ সালে সেনাপতি লাওয়ে মুরং এই প্যাগোডা নির্মাণ করেন। শুরুতে এটি ছোট ছিল। পরে ১৯০০ সালে দানবীর দঅং দালাল এর আকার বড় করেন।
স্থানীয় আইনজীবী ও গবেষক শিরুপন বড়ুয়ার লেখা বই ‘রামু’-তে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৭৮৪ সালের ডিসেম্বরে বর্মি রাজা বোদপায়া আরাকান দখলে নেন। আরাকানের শেষ স্বাধীন রাজা মহা থামাডাকে বন্দি করেন। এ সময় রাজা থামাডার ছোট ভাই লাওয়ে মুরং নাফ নদ পেরিয়ে টেকনাফে আসেন। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। তাঁকে আশ্রয় দেওয়ায় বর্মি রাজা বোদপায়া ক্ষিপ্ত হন। ১৭৯৪ সালের জানুয়ারির দিকে লাওয়ে মুরংকে ধরার জন্য টেকনাফে সৈন্য পাঠান। লাওয়ে মুরং পরিবারসহ রামুতে পালিয়ে আসেন। সে সময় সেখানে ছিল ব্রিটিশদের সেনা ক্যাম্প। এ ছাড়া ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সও তাঁর একটি প্রতিবেদনে লাওয়ে মুরং টেকনাফ ছেড়ে আরও উত্তরে চলে আসার বিষয়টি উল্লেখ করেন। ধারণা করা হচ্ছে, সেই সময়ে জাদিটি নির্মাণ করা হয়।
বর্তমান অবস্থা
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পাহাড় ক্ষয়ে প্যাগোডাটির সীমানাপ্রাচীর ধসে পড়ছে। ভাঙন ধরেছে জাদির গোড়ায়। বর্তমানে এই পুরাকীর্তি হুমকির মুখে পড়লেও রক্ষায় নেই কোনো উদ্যোগ। এ কারণে জীবনের হুমকি এড়াতে পর্যটকরা আর দেখতে যান না।
প্যাগোডাটি দেখভালের দায়িত্বে রয়েছে রাখাইন সম্প্রদায়ের কমিটি। এ কমিটির সভাপতি ঊথেনছিং রাখাইন বলেন, ছয়-সাত বছর ধরে পাহাড় ধসে জাদির সীমানাপ্রাচীর ভেঙে পড়েছে। সংস্কারের জন্য জনপ্রতিনিধি ও সরকারি দপ্তরে জানিয়েছি। কিন্তু কাজ হয়নি।
এ বিষয়ে রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাশেদুল ইসলাম বলেন, রামুর বৌদ্ধ পুরাকীর্তিগুলো বাংলাদেশের জন্য বিশেষ নিদর্শন। এগুলো রক্ষায় প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর কাজ করছে। পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসন থেকে জরুরি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জ/উ