
কয়েক বছর পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা জীবাশ্ম ও ভূপ্রকৃতি গবেষণার মাধ্যমে জানিয়েছিলেন যে, এখন যেমন রেড পান্ডা বিলুপ্তির পথে রয়েছে, ৭০ হাজার বছর পূর্বে মানব প্রজাতিও ঠিক একইভাবে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিলো। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব, কিন্তু কী হত যদি পৃথিবীতে মানুষ না থাকতো?
অনেকে বলেন, মানুষ না থাকিলে পৃথিবীর লাখ লাখ প্রজাতি রক্ষা পেতো। প্রকৃতির উপর প্রভাব বিস্তার করিবার মাত্র কয়েক হাজার বছর পূর্বে লন্ডনের নিকটবর্তী বনাঞ্চলে একটি প্রজাপতির যতটুকু ভূমিকা ছিল, মানুষের ভূমিকা বা সামর্থ্য তাহার চাইতে বেশি ছিল না।
কিন্তু মানুষ ক্রমশ যা করেছে, তাকে বলা যায় এই পৃথিবীকে এককভাবে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ওলটপালট করা। এই প্রকৃতিতে লাখ লাখ প্রজাতি বসবাস করে, মানুষ তার মধ্যে একটিমাত্র প্রজাতি। কিন্তু গত কয়েকশ বছরে বিশেষ করে শিল্পবিপ্লবের পর থেকে মানুষ সভ্যতার বিকাশ ও উন্নয়নের নামে প্রকৃতি উজাড় করে এমন সকল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে যার ক্ষত মেরামত করতে প্রকৃতি পাল্টে যাচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, শিল্পযুগের শুরু থেকে মানবসৃষ্ট কারণে উৎপাদিত অতিরিক্ত তাপের ৯০ শতাংশ শোষণ করে আসছিলো বিশ্বের মহাসাগরগুলো। তবে উষ্ণতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে মহাসাগরগুলোর কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
এই ব্যাপারে জলবায়ুবিজ্ঞানীদের কেউ কেউ বলছেন, বিশ্বের জলবায়ু মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে।
গত কয়েক দিন ধরে সারা দেশে অঝোর বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বর্ষার বিদায়কালের দিকে বৃষ্টি হবে, তাতে আশ্চর্যের কিছু নাই। কিন্তু এখন যা হচ্ছে, অল্প সময়ে ব্যাপক বৃষ্টিপাত। সিকিমে প্রবল বৃষ্টিতে হকড়াবানে কয়েক দিন পূর্বে ভয়াবহ বন্যা হয়েছে। মাত্র সপ্তাহখানেক পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের প্রায় ৮৫ লাখ মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিউ ইয়র্ক সিটি, লং আইল্যান্ড ও হাডসন ভ্যালি পানিতে ডুবে গিয়েছিলো। ডুবে গিয়েছিলো সাবওয়েগুলিও। সেখানে এমন বৃষ্টিপাত হয়েছে যা ১৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
গ্রিসে যেমন ঘূর্ণিঝড় ড্যানিয়েলের তাণ্ডব চালিয়েছে, প্রবল বৃষ্টিতে বন্যা হয়েছে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে, তেমনি লিবিয়াতেও হয়েছে ভয়াবহ বন্যা। বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে লিবিয়ায় কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। বিপর্যয়কর বন্যা বা বৃষ্টিপাত ছাড়াও ইতিমধ্যে উষ্ণতম বছর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে সদ্যসমাপ্ত সেপ্টেম্বর মাস।
বলা যায়, উষ্ণতম দিনের রেকর্ড এই বিশ্ব প্রতি বছরই ভাঙছে। স্পষ্টতই, ১ লাখ ২০ হাজার বছরের পুরাতন তাপমাত্রার রেকর্ড দিনের পর দিন ভেঙে দিচ্ছি আমরা। এ যেন এক নূতন পৃথিবী! কী এক বিপর্যয়কর যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছি আমরা!
বৈশ্বিক তাপমাত্রা এখন প্রতি বছরই অল্প অল্প করে বাড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের মাত্রাও আরো তীব্র হবে। তার ফলে পরিবর্তন ঘটতে পারে সমুদ্রস্রোতের। ফলে মৌসুমি বায়ুতেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। এর ফলে কোনো কোনো এলাকায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হতে পারে, অন্যদিকে কোথাও দেখা দিতে পারে ব্যাপক খরা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে মানুষ অনেক বেশি শহরমুখী হতে পারে। ফলে ভবিষ্যত্ পৃথিবীর সামগ্রিক চিত্র যথেষ্ট আতঙ্কের। এই সকল বিষয় মাথায় রেখে দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের সামগ্রিক পরিকল্পনা করা জরুরি।
এজন্য বর্তমানে পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনকে মোকাবিলা করার বিষয়টি পৃথিবীর বুকে মানুষের বাঁচা-মরার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব মোকাবিলায় আগামী নভেম্বরে জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। নিজ নিজ অবস্থান থেকে পৃথিবীকে রক্ষার এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে জরুরি এবং প্রশংসনীয়। আমাদের তো একটাই পৃথিবী। পৃথিবী রক্ষার মহাদায়িত্ব আমাদের সকলেরই। নিজ নিজ পরিসর হতে সেই চেষ্টা প্রতিটি রাষ্ট্রকে করতে হবে।
Badsha