
উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে কয়েক দিনের তীব্র রোদের তাপমাত্রায় অতিষ্ঠ জনজীবন। গরমে অস্বস্থি ও দুর্ভোগ নেমে এসেছে। এতে বেশি করে কষ্টে বেরেছে শ্রমজীবী ও খেটে খাওয়ামানুষগুলো। হাসপাতাল গুলোতে বেড়েছে রোগীর সংখ্যা।
ঠাকুরগাঁওয়ে ঘুরে দেখা যায়, ক্ষেতে ও মাঠে কাজ করা মানুষ গুলো প্রচন্ড গরমে হাঁসফাঁস করছে এবং একটু পর পর ছায়ায় গিয়ে পানি পান করতে দেখা গেছে। গরমের কারণে একটু স্বস্থির জন্য শিশু কিশোরদের পুকুরে গোসল করতে ও বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের ছাতা নিয়ে চলাচল করতে দেখা যায়।
এই রোদে ঘর থেকে তেমন মানুষ বেড়না হওয়ায় জেলার ব্যস্ততম সড়ক গুলোতে কম যানচলাচল লক্ষ্য করা গেছে। তাছাড়া প্রচণ্ড রোদের প্রভাব পড়েছে সবজির মাঠ গুলোতে। রোদে মাঠের সবজি গাছগুলো ঝিমিয়ে মরে যাওয়ার মত অবস্থা।
ঠাকুরগাঁও পরিত্যক্ত বিমানবন্দরের রানওয়েতে ভুট্টা শুকানো কাজ করছিলেন শাহিন নামে এক শ্রমিক।
তিনি বলেন, ‘খালি পায়ে হাটা যাচ্ছেনা। জুতা পরে হাটলেও জুতাসহ পা গরম হয়ে যাচ্ছে। এই রোদে কাজ করতে আমাদের খুব কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু উপায় নাই। আমরা গরিব মানুষ কাজ না করলে সংসার চলবে কিভাবে। তাই কষ্ট হলেও এভাবেই কাজ করতে হচ্ছে।
রাসেল ইসলাম নামে এক ভুট্টা ব্যবসায়ী বলেন, বিগত কয়েক বছরেও আমাদের এই দিকে এতো তাপদাহ হয়নি। কিন্তু এবার গত কয়েক দিন থেকে প্রচন্ড রোদ। আজকে এতো তাপমাত্রা শরীরে লাগতেছে মনে হচ্ছে যে ৩৮-৪০ ডিগ্রী তাপমাত্রা হবে। কিছুক্ষণ পর পর খালি পিপাসা লাগে।
রিনা বেওয়া নামে এক বৃদ্ধা নারী শ্রমিক বলেন, ঠিক ভাবে কাজ করা যাচ্ছে না। রোদে খালি পায়ে হাটাও যাচ্ছে না। তাই গাছের ছায়ায় বসে একটু বিশ্রাম নিচ্ছি।
শহিদুল হোসেন নামে এক কুমড়া চাষী বলেন, প্রচন্ড রোদের তাপে কুমড়ার গাছ গুলো মড়ে যাচ্ছে ও ফল গুলো পরিপক্ক নাহওয়ে পাকতে শুরু করেছে।
তেতুলিয়া থেকে ঢাকা গামি ট্রাাক চালক সবুজ ইসলাম বলেন, আমি তেঁতুলিয়া থেকে গাড়ি নিয়ে রাওনা দিয়েছি। আজকে প্রচন্ড গরমে গাড়ি চালাতে হাত-পা গুলো ঝাঁলাচ্ছে। তাই গাছের নিচে একটু থেমেছি। আসলে এমন তাপদাহ চলতে থাকলে জনজীবন থেমে যেতে পারে। এই গরমে মানুষদের আমাদের খুব কষ্ট হচ্ছে। তাই দোয়াকরি আল্লাহ যেন এমন তাপদাহ থেকে আমাদের রক্ষাকরে বৃষ্টি দান করেন।
অটো চালক কবির বলেন, তাপের কারণে অটোর কন্ট্রোলার তাড়াতাড়ি কেটে যাচ্ছে ও চাকা ঘনঘন পাংচার হচ্ছে। রোদের জন্য প্রয়োজন ছাড়া মানুষ বেড় হচ্ছেনা তাই যাত্রীও কম। এতে আমাদের খুব কষ্ট হয়ে গেছে চলাচল করতে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমরা কৃষকদের সব সময় পরামর্শ দিতে থাকি যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে নিয়মিত সেচ প্রদান করার। যদি সেচ ব্যবস্থা কৃষকরা ঠিক রাখাতো তাহলে বেশি তাপমাত্রায়েও গাছ ঝিমে বা মরে যাওয়া রোধ করা সম্ভব। তাই তিনি কৃষকদের ফসলে সঠিক ভাবে সেচ প্রদান করার পরামর্শ দেন।
ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মেডিকেল অফিসার ডা. ফিরোজ জামািন জুয়েল বলেন, পশ্চিমা দেশ গুলোর সাথে সাথে আমাদের বাংলাদেশের তাপমাত্রাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে হাসপাতালে আমাদের রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতিরিক্ত গরমের ফলেডিহাইড্রেশন রোগ, যেটা পানিশূন্যতা বলে। এয়াড়াও ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তাই চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে ডিহাইড্রেশন রোধে আমাদের বেশি বেশি তরল জাতীয় খাবার খেতে হবে। এর সাথে পানিতে স্বল্প পরিমাণ লবণে মিশিয়ে খেলে শরীরে লবণের স্বল্পতাও পুরণ হবে বলে জানান তিনি। এছাড়াও তেমন জরুরী কাজ না থাকলে দুপুরের খোরা রোদে ঘর থেকে শিশু ও বয়ষ্কদের বের না হওয়ার পরামর্শ দেন।
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার তথ্য মতে শূক্রবার (১২ মে) সর্বোচ্চ ৩৯.৯ ডিগ্রী ও সর্বোনিম্ন ২৫.৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা ছিল পঞ্চগড়ে। সে তুলনায় ঠাকুরগাঁওয়ে সচরাচর ১-২ ডিগ্রী তাপমাত্রা সব সময় বেশি থাকে।
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাসেল শাহ বলেন, বঙ্গপসাগরে লঘুচাপ ঘনভূত হওয়ায় আবহাওয়া ঘূর্ণী ঝড়ের দিকে এগুচ্ছে। এটি এখনো সঠিক ভাবে বলা যাচ্ছে না তবে এটি ঘূর্ণিঝড়ের আকার হতে পারে। লঘুচাপ নিম্নচাপে পরিনত হতে আরও দুই একদিন সময় লাগবে। নিম্নচাপে পরিনত না হওয়া পর্যন্ত উত্তরাঅঞ্চলে যে তাপমাত্রা বিরাজ করছে এই তাপমাত্রা অব্যাহত থাকবে। নিম্নচাপ হওয়ার পরবর্তী সময় আস্তে আস্তে তাপমাত্রা কমতে থাকবে ও বৃষ্টিপাতও হতে পারে বলে আশা করা যাচ্ছে।