
দেশের মুখ উজ্জ্বল করা কলসিন্দুরের দুর্জয় নারী ফুটবল টিমের মতো কালিয়াকৈরে এক লড়াকু নারী ফুটবল টিম গড়ে উঠছে। হাটিহাটি পা পা করে দৃঢ় প্রত্যয়ে এরা এগিয়ে চলছে। বিগত তিন বছরের কঠিন সাধনায় আজ তারা গড়ে তুলেছে শক্তিশালী ফুটবল টিম। নারী ফুটবল প্রতিযোগীতার তেমন কোন ভাল সুযোগ এখনো বাংলাদেশে তৈরি হয়নি।
সেই বাঁধা অতিক্রম করে এরা নিজেদের মধ্যেই দু'দলে বিভক্ত হয়ে এলাকার বিভিন্ন স্থানে নারী ফুটবল খেলার আয়োজন করছে। স্থানীয় সাধারণ জনগোষ্ঠী তাদের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। সাধারণত কিশোর যুবদের মধ্যে মাদকের ছোবল, বাল্য বিয়ে, ইভটিজিং, মোবাইল আসক্তি এসব প্রতিরোধে খেলাধুলা খুবই কার্যকরী ভূমিকা রাখে।
জাতীয় ফুটবল টিমের সাবেক খেলোয়ার আশরাফুল জুয়েল তাঁর একক প্রচেষ্টায় এই নারী ফুটবল টিমটি গড়ে তুলেছেন। গ্রামে গ্রামে, স্কুলে স্কুলে ঘুরে তিনি ফুটবল খেলায় আগ্রহী ছাত্রীদের সংগঠিত করেন। গড়ে তোলেন "কালিয়াকৈর জুয়েল স্পোর্টস একাডেমি।
সংগঠনটি ইতোমধ্যে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে নিবন্ধীত হয়েছে (রেজি: নং ১৫৮ তাং ১২/০১/২০২৩)। একাডেমিতে ফুটবল ও কাবাডি খেলা প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা রয়েছে। উভয় খেলার কোচ হিসেবে জুয়েল নিজেই দায়িত্ব পালন করছেন। প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা নারী ফুটবল ৪৪ জন, নারী কাবাডি ১৬ জন। পুরুষ ফুটবল/ কাবাডি ২৪ জন। এরা সবাই প্রাইমারী স্কুল ও হাই স্কুলের শিক্ষার্থী।
এসব প্রশিক্ষণার্থীরা পল্লী গ্রামের আদিবাসী ও প্রান্তিক পরিবারের সন্তান। নুন আনতে পান্তা ফুরায় এমন পারিবারিক অবস্থা। অভাব অনটনের সংসার। সব বাধা মাড়িয়ে ওরা এগিয়ে যাচ্ছে মনের জোরে স্বপ্ন জয়ের সন্ধানে। বেশীর ভাগ প্রশিক্ষনার্থীর বসবাস উপজেলা সদর থেকে ১৫/২০ কিলো মিটার দুরত্বে ঢুলিগড়া, ভালুকভেড়, মজিদচালা এসব অজঁ পাড়া গাঁয়ে। অনেক সময় পরিবহন ভাড়ার অভাবে ওরা পায়ে হেটেও নিয়মিত অনুশিলনে অংশগ্রহণ করে থাকে। কালিয়াকৈর পৌরসভার গোয়ালবাথান মৌজার বাসিন্দা আশরাফুল জুয়েল একজন নিস্বার্থ সমাজ গড়ার কারিগর। শত কষ্টেও তিনি হাসিমুখে স্থানীয় কিশোর কিশোরীদের নিয়ে তাঁর অভিযান চলমান রেখেছেন। তিনি ১৯৮২ সনে জাতীয় ফুটবল টিমে খেলতেন।
এরপর বিকেএসপি সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাকে কোচ হিসেবে নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু চীর কুমার এই তরুন কোথাও চাকরি না করে সমাজকে মাদকমুক্ত করতে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলায় উৎসাহিত করার মন্ত্র নিয়ে মাঠে নামেন। দীর্ঘদিনের সাধনায় এখন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকগণ তাঁর কথায় আগ্রহী হচ্ছে। কিন্তু বিভিন্ন সমস্যায় প্রশিক্ষণের কাজ ঠিকমতো করতে পারছেন না।
জুয়েল জানান, নিয়মিত অনুশিলন করার জন্য উপযোগী কোন মাঠ নেই। মাঠের কোন ব্যবস্থা না থাকায় জাতিরপিতা বঙ্গবন্ধু সরকারী কলেজের মাঠে প্রকাশ্যে মেয়েদের অনুশিলন করাতে হচ্ছে। এতে মেয়েদের অনেক দূর্ভোগ পোহাতে হয়।
শুক্রবার, শনিবার দুইদিন অনুশিলন। সকালে মেয়েদের, বিকালে ছেলেদের। কলেজ খোলা থাকলেও অনুশিলনে সমস্যা হয়। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সমাজকর্মী কেউ পাশে দাড়াঁয় না। মেয়েদের পোষাক পরিচ্ছদ পরিবর্তনের জন্য অনুশিলন মাঠে একটি গৃহ দরকার, সেটাও নেই। নিয়মিত অনুশিলনের জন্য দরকার বল, বুট, জার্সি, ট্রাকস্যুট।
এছাড়া শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও লেখাপড়ার খরচও দরকার। প্রান্তিক পরিবারের মেয়েদের পক্ষে এসব খরচ বহন করা অসম্ভব। কিন্ত কেউ সহযোগীতা দেয় না। তবু জুয়েল দমে যাবার পাত্র নন। তিনি দুর্বার গতিতে তাঁর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই নারী ফুটবল টিম সদস্যাদের দাবি, একটি নির্দিষ্ট খেলার মাঠ ও একটি ক্লাবঘর। কবে তাদের দাবী পুরন হবে? সরেজিমনে নারী ফুটবল টিমের অনুশিলন দেখতে গিয়ে কিশোরী খেলোয়ারদের অসাধারণ নৈপুণ্য দেখা গেলো। চন্দ্রা জাতিরপিতা বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজ মাঠে প্রশিক্ষণার্থী অনেকের সাথে কথা হয়।
জানা গেল, এসব প্রান্তিক পরিবারের কিশোরীদের দৃঢ় মনোবল, প্রত্যয় ও খেলার প্রতি প্রবল আগ্রহের কথা। সত্যি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এরা আমাদের দেশের নাম ছড়িয়ে দিতে পারবে দুনিয়া জোড়া। এলাকাবাসী এদের পাশে দাড়াঁলে এরা সমাজকে ভালো কিছু দিতে পারবে।
প্রশিক্ষণার্থী কিশোরীদের একজন ইতি কুমারী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি কোচ সম্প্রদায়ের মেয়ে। জাথালিয়া মজিদচালা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৭ম শ্রেণীতে অধ্যায়নরত। বাবা আরেকটা বিয়ে করে ফেলে রেখে চলে গেছে। মা শ্রমজীবি। নানা নানীর কাছে ঢুলিগড়া গ্রামে বসবাস করে।
কথা বলে জানা যায়, জুয়েল একাডেমির সকল প্রশিক্ষণার্থীই সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠির ছেলে মেয়ে।
এরা বিভিন্ন স্কুলে লেখাপড়া করছে। অনামিকা রানী রায়, পিংকি সরকার, সীমা আক্তার, পর্জুমা রানী, কনিকা রানী, রেশমা আক্তার, মারিয়া আক্তার, বিথি আক্তার, সানিয়া আফরিন, সিমা আক্তার, রাবেয়া বসরি, সেতু রানী, শিখা রানী, সুমা রানী, বর্ষা রানী কারো অবস্থায় ভালো নয়।
এদের অভিভাবকের পক্ষে লেখাপড়ার খরচ চালানোই কষ্টসাধ্য। আবার খেলাধুলার খরচ বহন অসম্ভব বিষয়। এই নারী ফুলবল দলের অধিনায়ক পুস্পিতা রানী সরকার, একাদশ শ্রেনীর শিক্ষার্থী। সে তার টিম সদস্যদের লেখাপড়াসহ খেলাধুলার জন্য সকলের সার্বিক সহযোগীতা প্রত্যাশী।
জ/আ