
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ১১টি প্রতিষ্ঠান বছরে ৫০০ কোটি টাকার বেশি ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২০১৮ সালে এ অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরকে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেন।
নির্দেশ অনুযায়ী ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পাঁচ বছরের ভ্যাট প্রদানের বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে।
সে সময় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বাৎসরিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন চেয়ে চিঠি পাঠায় ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদপ্তর। একই সাথে প্রতিষ্ঠানসমূহের লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য জানানোর জন্য বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে তলবীপত্র পাঠানো হয়। বর্তমানে এ তদন্ত কার্যক্রম হিমাগাড়ে পড়ে আছে।
ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর সূত্র জানায়, তদন্ত কার্যক্রমের শুরুতে ২০১৮ সালের ৫ সেপ্টেম্বর রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠানে একযোগে অভিযান চালায় ভ্যাট গোয়েন্দার একাধিক দল।
কর ফাকির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় কাগজপত্র ও কম্পিউটার জব্দ করা হয়। অভিযানটি এনবিআরের টাস্কফোর্সের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে চালানো হয়। এ টাস্কফোর্স কর ফাঁকি বন্ধে কাজ করে থাকে। ভ্যাট গোয়েন্দার ৫টি টিম নাটোর, নরসিংদী ও প্রাণের হেড অফিসে একযোগে অভিযানে অংশ নেয়।
সূত্র জানায়, প্রাণ ফুডস লিঃ, বঙ্গ বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল লিঃ, রংপুর ফাউন্ড্রি লিঃ, রংপুর মেটাল ইন্ড্রাস্ট্রিজ লিঃ (ট্রেডিং ইউনিট), রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিঃ (ইউনিট-২), রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিঃ (ইউনিট-৩), রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিঃ (কাঁচপুর ইউনিট), রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিঃ (ভুলতা-১ ইউনিট), রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিঃ (ভুলতা-২ ইউনিট), প্রাণ আরএফএল প্লাস্টিক লিঃ এবং প্রাণ-আরএফএল এক্সপোর্ট লিঃ প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়া হয়।
ভ্যাট গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এনবিআরের সিলেট কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের নিরীক্ষায় ২০১৭ সালে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের প্রায় ৪০ কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকির তথ্য বেরিয়ে আসে।
কাঁচামাল আমদানির তথ্য গোপন, অনুমোদন ছাড়া রফতানি ও অবৈধভাবে রেয়াত নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ওই কর ফাঁকি দেয়। অভিযোগ রয়েছে, এভাবে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছে।
ভ্যাট গোয়েন্দা সূত্র জানায়, হবিগঞ্জের ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে রয়েছে গ্রুপটির রংপুর মেটালের কারখানা। এখানে দুটি ইউনিটে বাইসাইকেল, টায়ার, রিম, স্পোক, ক্যাবলওয়্যার, এমএস পাইপ, জিআই পাইপ ও টিউব তৈরি করা হয়।
এর মধ্যে একটি ইউনিটের বন্ড লাইসেন্স নেয়া আছে। অন্য ইউনিটের নেই। অথচ দুটি ইউনিট পণ্য উৎপাদনে একই কাঁচামাল ব্যবহার করে।
রাজস্ব কর্মকর্তারা বিস্মিত হন-ইউনিট দুটোর আলাদা ব্যবসা নিবন্ধন নম্বর (বিআইএন) থাকলেও আয়কর অফিসে ইউনিট দুটোর টিআইএন একটিই, যা কোনভাবে হওয়ার সুযোগ নেই।
সমজাতীয় পণ্য উৎপাদনকারী দুটি ইউনিট পাশাপাশি হওয়ায় রাজস্ব ফাঁকির আশঙ্কা করেন তারা। সূত্র জানায়, নিরীক্ষার জন্য তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে ওই সময় রংপুর মেটালকে ৯ বার চিঠি দেয়া হলেও প্রতিষ্ঠানটি তদন্ত দলকে সহযোগিতা করেনি।
পরে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড (কাস্টমসের ডাটাবেজ সফটওয়্যার) থেকে আমদানি তথ্য ও কর অঞ্চল-৬ চিঠির মাধ্যমে বার্ষিক অডিট রিপোর্ট ও আয়কর রিটার্ন থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিরীক্ষা করা হয়।
সূত্র জানায়, পরবর্তীতে করোনার কারণে তদন্ত কার্যক্রম স্থিমিত হয়ে পড়ে। এ বিষয়ে সর্বশেষ অবস্থা জানার জন্য গত ১৬ ফেব্রুয়ারি হতে ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরে একাধিকবার উপস্থিত হয়ে কমিশনার ড. আব্দুর রউফ এর সাক্ষাৎ কামনা করলেও তিনি এ প্রতিবেদককে সাক্ষাৎ দেননি।