নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষা
পাঁচ ব্যাংকের ঘটনায় গ্রেফতার ১৬, কয়েকজন জামিনে, অধরা গডফাদাররা
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৪ মে, ২০২২, ৪:১৯ পিএম আপডেট: ২৪.০৫.২০২২ ৭:১৬ পিএম

নিয়োগ পরীক্ষা ও মেডিকেল-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় প্রায়ই প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। এসব ঘটনায় জড়িত সন্দেহে অনেককেও গ্রেফতার করা হচ্ছে। রিমান্ডে কেউ কেউ নিজের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দিও দিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ হচ্ছে না। 

কারণ নেপথ্য নায়ক বা গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছেন। আড়াল থেকে তারা গ্রেফতার ব্যক্তিদের জামিনের ব্যবস্থা করছেন। জামিনের পর নতুন উদ্যমে আবারও তাদের সংগঠিত করা হচ্ছে। 

সম্প্রতি প্রশ্ন ফাঁসের একাধিক ঘটনায় নেপথ্য নায়ক হিসাবে শিক্ষা কর্মকর্তা চন্দ্র শেখর হালদার ওরফে মিল্টন, বুয়েট শিক্ষক নিখিল রঞ্জন ধর এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা আলমাস আলীসহ কয়েকজনের নাম এসেছে। কিন্তু তাদের গ্রেফতার করা হয়নি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, তিন মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। 

প্রথমত ছাপাখানা বা প্রেস থেকে প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। ছাপার সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা প্রশ্ন চুরি করে। এরপর অর্থের বিনিময়ে তা বাইরে বিক্রি করে দেয়। 

দ্বিতীয়ত বিতরণের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রশ্ন ফাঁস করে। প্রশ্নপত্র কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার সময় মোবাইল ফোনে ছবি তুলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। 

তৃতীয়ত ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে প্রশ্ন বাইরে পাঠিয়ে উত্তর জেনে নেওয়া হয়। এছাড়া সাদা খাতা জমা দেওয়ার মাধ্যমেও নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষায় অনিয়ম-দুর্নীতি করা হয়। এ ক্ষেত্রে অসাধু শিক্ষক-কর্মকর্তা ও চক্রের সদস্যদের সঙ্গে পরীক্ষার্থীর আগেই যোগাযোগ হয়ে থাকে। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী খাতায় রোল নম্বরসহ নানা তথ্যাদি লেখার পর আর কিছু না লিখে পরীক্ষার্থী সেটি জমা দিয়ে আসে। পরে চক্রের সদস্যরা ওই খাতা বের করে উত্তর লিখে দেয়।

সূত্র জানায়, ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির অধীনে পাঁচ ব্যাংকের ১ হাজার ৫১১টি অফিসার (ক্যাশ) পদে পরীক্ষা হয়। গত বছরের ৬ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ওই পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ছাপাখানা থেকে ফাঁস হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেফতার করেছে ডিবি। গ্রেফতাররা হলো- মিজানুর রহমান মিজান, রাশেদ আহমেদ বাবলু, মুক্তারুজ্জামান রয়েল, শামসুল হক শ্যামল, জানে আলম মিলন, মোস্তাফিজুর রহমান মিলন, রাইসুল ইসলাম স্বপন, সোহেল রানা, এমদাদুল হক খোকন, এবিএম জাহিদ, আব্দুল্লাহ আল জাবেদ জাহিদ, মহিবুল, রবি এবং আহছান উল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন কর্মচারী দেলোয়ার, পারভেজ মিয়া ও রবিউল ইসলাম। তাদের মধ্যে পাঁচ ব্যাংক কর্মকর্তা হলেন- জনতা ব্যাংক কর্মকর্তা শামসুল হক শ্যামল, এমদাদুল হক খোকন ও সোহেল রানা, পূবালী ব্যাংক কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান মিলন এবং রূপালী ব্যাংক কর্মকর্তা জানে আলম মিলন। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে তাদের বরখাস্ত করা হয়েছে। 

গ্রেফতারদের মধ্যে জাহিদ, জানে আলম মিলন ও এমদাদসহ কয়েকজন জামিন পেয়েছেন। আদালতে ১৬৪ ধারায় মিজানুর রহমান, দেলোয়ার হোসেন ও পারভেজ মিয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তারা প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত হিসাবে বুয়েট শিক্ষক নিখিল রঞ্জন ধর এবং বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা আলমাস আলীর নাম বলেছেন। তবে এখনো তাদের গ্রেফতার করা হয়নি।

নিখিল ও আলমাসকে কেন গ্রেফতার করা হয়নি-জানতে চাইলে ডিবির যুগ্ম কমিশনার হারুন অর রশীদ বলেন, জবানবন্দিতে তাদের নাম এলেও সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে গ্রেফতার ব্যক্তিদের কাছ থেকে উদ্ধার মোবাইল ফোন, ডিভাইস ও অন্য সব আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে। ফরেনসিক রিপোর্টে অন্য কারো জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে গোয়েন্দা কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ বলেন, বুয়েট শিক্ষক হয়েও নিখিল কেন আহছান উল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপাখানায় গিয়েছিলেন তা জানতে বুয়েটকে চিঠি দিয়েছিলাম। বুয়েট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তিনি (নিখিল) কারিগরি সাপোর্টের দায়িত্বে ছিলেন।
আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে মিজানুর রহমান বলেন, পরীক্ষার আগের দিন রাত ৯টার দিকে বাবলু আমার হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্নপত্র পাঠায়। সঙ্গে সঙ্গেই আমি তা জাহিদের হোয়াটঅ্যাপে পাঠিয়ে দেই। পরীক্ষার পর জাহিদ আমার কাছে বাকি টাকা চান। তাকে জানাই, ‘লিখিত পরীক্ষার পর বাকি টাকা দেব’। কিন্তু তার আগেই ঘটনা জানাজানি হয়। কীভাবে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করেন তা আমি বাবলুর কাছে জানতে চাই। বাবলু জানান, আহছান উল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পরিচিত মুবিনের ভগ্নিপতি দেলোয়ার হোসেন অফিস সহকারী হিসাবে চাকরি করেন। মুবিনকে প্রশ্ন দিত দেলোয়ার।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে দেলোয়ার হোসেন বলেন, আহছান উল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি পিয়ন হিসাবে চাকরি নেই। এ বিশ্ববিদ্যালয় ব্যাংকসহ বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ছাপানো ও পরীক্ষা নেওয়া সংক্রান্ত টেন্ডার পেয়ে থাকে। প্রশ্নপত্র ছাপার সময় মাঝেমধ্যে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপাখানায় যেতাম। এ সময় মুক্তারুজ্জামান মুক্তার ও পারভেজ মিয়া আমাকে প্রলোভন দেখাত। রবিউলের সঙ্গে তারা আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়। তিনি আরও বলেন, পরীক্ষার টেন্ডারগুলো আনতেন বুয়েটের শিক্ষক নিখিল ধর। তিনিই সব নিয়ন্ত্রণ করতেন। প্রশ্নপত্র ছাপা হওয়ার পর তিনি ব্যাগে প্রশ্ন ঢুকিয়ে নিতেন। আমি নিজেও অনেকবার তার ব্যাগে প্রশ্নপত্র দিয়েছি।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) অফিস সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক পদে নিয়োগ পরীক্ষার নাটের গুরু হিসাবে মাউশি কর্মকর্তা চন্দ্র শেখর হালদার ওরফে মিল্টনের প্রাথমিক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। কিন্তু তাকে আইনের আওতায় আনা যায়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহাদাৎ হোসেন সুমা বলেন, সাইফুলের বক্তব্যে মিল্টনের নাম এলেও তাকে গ্রেফতার করা হয়নি। আমরা সাইফুলের বক্তব্যসহ আরও অনেক কিছু মিলিয়ে দেখছি। সবকিছু মিলে গেলে মিল্টনকে আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি আরও বলেন, ১৩ মে মাউশিতে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এক প্রশ্নের জবাবে এডিসি সুমা বলেন, বিতরণের জন্য নিয়ে যাওয়ার সময় এ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে।

মাউশির এক কর্মকর্তা জানান, মাউশির দুই কর্মচারীকে শোকজ করা হলেও সোমবার পর্যন্ত শিক্ষা কর্মকর্তা চন্দ্র শেখর হালদার মিল্টনের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। 

এমনকি তার অনুপস্থিতির বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে পর্যন্ত অবহিত করা হয়নি। এ ব্যাপারে মাউশির পরিচালক অধ্যাপক শাহেদুল খবির চৌধুরী বলেন, ক্যাডার কর্মকর্তা হিসাবে তার (মিল্টন) বিরুদ্ধে মাউশি কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। আমরা পুলিশি প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করছি। তা পেলে মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে।


-জ/অ

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft