
মেহেরপুর এ প্রথম কিয়ামুল লাইল নামাজ শুরু করা হয়েছে। মেহেরপুর ১নং ওয়ার্ডের ভৈরব জামে মসজিদে রাত ১২টা ১০ মিনিটে এ নামাজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
লাইলাতুল কদর খোঁজার অন্যতম ইবাদত হলো কিয়ামুল লাইল নামাজ। গভীর রজনীতে আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য ও নৈকট্য অর্জনের আশায় দুনিয়ার সব ব্যস্ততাকে দূরীভূত করে কায়মনোবাক্যে নিজের মস্তক অবনত করা।
আল্লাহর খালিস বান্দা হওয়ার জন্য, নিজের মনের সব আশা-আকাক্সক্ষা, দুঃখ-বেদনা, আকুতি পেশ করার উত্তম মাধ্যম হলো কিয়ামুল লাইল নামাজ। কিয়াম শব্দের অর্থ দাঁড়ানো বা দন্ডায়মান হওয়া।
আর দন্ডায়মান হওয়া নামাজের আরকানের একটি। এখানে কিয়ামুল লাইল বলতে গভীর রজনীতে দাঁড়িয়ে যে নামাজ আদায় করা হয়, তাকে বোঝানো হয়েছে।
যে নামাজের ব্যাপারে মহাগ্রন্থ আল কোরআনের সুরা মুযযাম্মিলে বর্ণিত হয়েছে- ‘রাতে জাগরণ করো (নামাজ আদায় করো)। রাতের কিছু অংশ বা তার কম অথবা তার একটু বেশি।’
আর নফল নামাজের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতময় নামাজ হচ্ছে কিয়ামুল লাইল, যা তাহাজ্জুদ নামাজ হিসেবে পরিচিত।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা মুত্তাকিদের গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে ঘোষণা করেন : ‘তারা রাতের সামান্য অংশেই নিদ্রায় যেত এবং রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত’ (সুরা আয্যারিয়াত :১৭-১৮)। সুতরাং রাতে কম ঘুমিয়ে নামাজে মশগুল থাকা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা নেককার, পরহেজগার ও মুত্তাকিদের অন্যতম বিশেষ গুণ।
এছাড়াও কদরের রাত প্রাপ্তির আকাক্সক্ষায় এতেকাফ শুরু হয়েছে। মসজিদে মসজিদে অবস্থান নিয়েছেন মোমেন অতিথিরা। আল্লাহ তায়ালার খাঁটি বান্দাদের অন্যতম গুণ হলো তারা রাতে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর সান্নিধ্য লাভের জন্য সিজদা, কিয়াম ও তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করেন।
আল্লাহ তায়ালার খাঁটি বান্দারাই কিয়ামুল লাইল করেন এবং তারা আল্লাহ তায়ালাকে ডাকেন ভয় ও আশায়। রাসুল (সা.) রমজান মাসে কিয়ামুল লাইল বা রাত্রিকালীন ইবাদতকে অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছেন।
তিনি অন্য যেকোন মাসের তুলনায় এ মাসে বেশি কিয়ামুল লাইল আদায় করেছেন। কিয়ামুল লাইল নামাজ আদায় করলে গুনাহ মাফের নিশ্চয়তা দিয়েছেন।
* রমজানে কিয়ামুল লাইলের গুরুত্ব ও ফজিলতঃ
রাসুল (স.) রমজান মাসে কিয়ামুল লাইল বা রাত্রিকালীন ইবাদতকে অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি অন্য যেকোন মাসের তুলনায় এ মাসে বেশি কিয়ামুল লাইল করেছেন। কিয়ামুল লাইল করলে রাসূল সা. গুনাহ মাফের নিশ্চয়তা দিয়েছেন।
রাসূল সাঃ বলেছেন- "নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক রমজান মাসের রোজা তোমাদের ওপর ফরজ করেছেন। আর আমি তোমাদের জন্য নিয়ম করেছি এ মাসের কিয়ামুল লাইল বা রাত্রিকালীন ইবাদতকে।
সুতরাং কোন ব্যক্তি যদি পূর্ণ ঈমান সহকারে এবং গুনাহ মাফের আশায় এ মাসে রোজা রাখে ও কিয়ামুল লাইল করে, তাহলে সে এমন নিষ্পাপ হয়ে যায়, যেমন নিষ্পাপ তার মা তাকে প্রসব করেছে।
তিনি আরও বলেন, যে ব্যক্তি রমজান মাসে পূর্ণ ঈমান সহকারে ও গোনাহ মাফের আশায় কিয়ামুল লাইল করবে, তার আগের সব গোনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। এ মাসে রাসূল (স.) নিজেও কিয়ামুল লাইল করেছেন এবং আমাদেরও তা করতে বলেছেন।
রাত্রিকালীন ইবাদত তারাবি বা অন্য নামাজও হতে পারে। তারাবি নামাজে কুরআন খতম করার রেওয়াজ সারা দুনিয়ায় আছে। কুরআন নাজিলের মাসে প্রতি রমজানে তারাবির মাধ্যমে কুরআন অন্তত এক খতম হয়।
রমজানে কুরআনের এক খতম অন্য মাসের অন্তত ১০ খতমের সমান। তবে আমাদের দেশে তারাবিহ নামাজে যেভাবে কুরআন তিলাওয়াত করা হয়, তা কতটা শুদ্ধভাবে হয় তা আল্লাহ পাকই ভালো জানেন।
তারাবি নামাজে আরও সুললিত কণ্ঠে আরও হৃদয়গ্রাহী করে আরও সহীহ শুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত করা উচিত। আমাদের মনে রাখা উচিত, নামাজে যত বেশি সহীহ শুদ্ধ করে কুরআন তিলাওয়াত করা হবে, আমাদের নামাজ তত বেশি সহীহ শুদ্ধ হবে।
রাসূল সা. তার জীবনে রাত্রিকালীন নফল নামাজ ও তাহাজ্জুদ নামাজই বেশি পড়েছেন। রাসূল (স.) তাঁর জীবনে মাত্র তিন রাত তারাবি নামাজ পড়েছেন এবং জামাত সহকারে তিনি পড়েছেন।
তিনি তিন রাতই রাতের শেষভাগে তারাবি আদায় করেছেন। তারাবি নামাজ ফরজ বা অপরিহার্য হওয়ার ভয়ে রাসূল (স.) তা পরিত্যাগ করেছেন। যেমন রাসূল (স.) নিজেই বলেছেন, আমার আশঙ্কা হচ্ছে- তোমরা একে ফরজ করে নেবে অথবা তোমাদের ওপর ফরজ করা হবে।
রাসূল সা. পরিত্যাগ করলেও সাহাবীগণ ব্যক্তিগতভাবে তা অব্যাহত রেখেছেন। রাসূল (স.) এর সাথে সাহাবীগণ জামাতে আট রাকাত আদায় করতেন এবং বাকি ১২ রাকাত অনেকে ব্যক্তিগতভাবে পড়ে নিতেন। তারাবি নামাজ অপরিহার্য হওয়ার ভয়ে রাসূল (স.) জামাত পরিত্যাগের পর তা পুনরায় চালু করেন হজরত ওমর রা.।
মাঝখানে কয়েক বছর সাহাবীগণ তা ব্যক্তিগতভাবে বা ছোট ছোট জামাত আকারে আদায় করেছেন। হজরত ওমর রা. ছোট ছোট জামাতের প্রথা বিলুপ্ত করে একসাথে তারাবি নামাজ পড়ার আদেশ দেন।
হজরত ওমর রা. মনে করলেন, রাসূল সা. যেহেতু আট রাকাত জামাতের সাথে এবং বাকি ১২ রাকাত ব্যক্তিগতভাবে পড়েছেন, তাই (৮+১২)=২০ রাকাত নামাজই পড়া দরকার।
তাই তিনি ২০ রাকাত নামাজ কেন্দ্রীয়ভাবে বা সবাই সম্মিলিতভাবে আদায় করার জন্য হজরত উবাই ইবনে কাবকে ইমাম নিযুক্ত করেন। তৎকালীন কোন সাহাবায়ে কেরাম এর বিরোধিতা করেননি। বরং সব সাহাবায়ে কেরামের ঐক্যমতের ভিত্তিতেই তা হয়েছে।
হজরত ওসমান রা. এবং হজরত আলীর রা. শাসনামলেও এর অনুসরণ করা হয়। তিনজন খলিফার একমত হওয়া এবং সাহাবায়ে কেরামগণের ভিন্নমত পোষণ না করার কারণে বলা যায়, রাসূল সা. -এর সময় থেকে তা ২০ রাকাত পড়ার অভ্যাস ছিল।
ইমাম আবু হানিফা র., ইমাম শাফেয়ি র. ও ইমাম আহমদ র. তারাবিহ ২০ রাকাত পড়তেন। তবে আহলে হাদিসের লোকজন আট রাকাতের পক্ষে। তারা আট রাকাতকেই প্রতিষ্ঠিত সুন্নত বলে মনে করেন।
ইমাম মালেক র. ৩৬ রাকাতের পক্ষে। তিনি বলেন- শতাধিক কাল ধরে মদিনায় তিন রাকাত বিতর ও ৩৬ রাকাত তারাবিহ পড়ার প্রচলন ছিল।
সুতরাং তারাবি নামাজ যত রাকাতই পড়া হোক না কেন, তা কিয়ামুল লাইল হিসেবে গণ্য হবে। মসজিদে ইমাম সাহেব যত রাকাত তারাবিহ নামাজ জামাতের সাথে আদায় করেন ঠিক তত রাকাত নামাজ ইমাম সাহেবের সাথে আদায় করলে বা শেষ রাকাত পর্যন্ত আদায় করলে, রাসূল সা. বলেছেন- সারারাত কিয়ামুল লাইলের ছওয়াব তাকে দেয়া হবে। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে কিয়ামুল লাইল কদরের রাতের ইবাদত করে তার সকল সওয়াব পাওয়ার জন্য কবুল করুন, আমিন।