নাব্যতা হারিয়ে ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা এখন প্রাণহীন
প্রকাশ: রোববার, ১৯ মার্চ, ২০২৩, ৫:৫৭ পিএম

চর-দ্বীপচরের প্রতিটি বালুকণায় মিশে আছে হাজারো মানুষের হাড়ভাঙা শ্রম। যাদের শ্রমে-ঘামে কমলা-হলুদ সোনায় ভরে উঠে বিস্তীর্ণ বালুচর। গবাদি পশুর একটা বড় অংশই আসে চরাঞ্চলের গতরখাটা মানুষের গোয়াল থেকে। অথচ এ জনপদে জীবন একটা এক দুর্বিষহ গল্পগাথা। গ্রীষ্মকাল মানেই দুঃখ-কষ্টের পাহাড় তাদের। 

নদ-নদী শুকিয়ে যখন বিশাল মরু, তখন মাইলকে মাইল পাড়ি দিতে হয় পায়ে হেঁটে। রোগে আক্রান্ত হলেও সুযোগ-সুবিধার অভাবে নিরুপায় সাধারণ মানুষ। কখনো কখনো চিকিৎসকের মুখ দেখার আগেই দেখা হয়ে যায় আজরাইলের সাথে। তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা বেষ্টিত গাইবান্ধার অন্ততপক্ষে ৩৫ শতাংশ নদ-নদী ও চরাঞ্চল। 

জেলার মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ মানুষের বসবাস সুন্দরগঞ্জ, সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার ২৮টি ইউনিয়নের ১৬৫টি চর-দ্বীপচরে। সেখানে অন্তত  ৪৭ শতাংশ মানুষেরই জীবনমান দারিদ্র্য সীমার নিচে। বন্যা, নদীভাঙন, শৈত্যপ্রবাহ, খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করেই কেটে যায় এসব মানুষের  জীবন। 

অথচ গত ৩ দশকে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের বেশকিছু বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে এসব চর-দ্বীপচরে বাস্তবায়ন করা হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রকল্প। তবুও উন্নয়ন ধরা দেয়নি এখানকার মানুষের জীবনে। প্রাণিসম্পদ ও কৃষিতে কিছুটা সফলতা এলেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, নারী উন্নয়ন, মাতৃমৃত্যু রোধ, অপুষ্টি, শিশু বিয়ে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কারিগরি শিক্ষা, তথ্য ও প্রযুক্তিতে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বেশ পিছিয়ে গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের মানুষ। নদীর নাব্যতা সংকটে ভেঙে পড়েছে নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থাও। 

প্রাথমিক শিক্ষায় কিছুটা অগ্রগতি হলেও বেসরকারি উদ্যোগে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে মোটে চারটি। এখন পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কোনো কলেজ গড়ে না ওঠায় উচ্চ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত চরের ছেলে-মেয়েরা। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী চরাঞ্চলে অস্বাস্থ্যকর স্যানিটেশন, অপুষ্টি, বাল্যবিয়ে ও ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা গাইবান্ধা জেলায় সবচেয়ে বেশি। 

গাইবান্ধা জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, চরাঞ্চলে বর্তমানে বিভিন্ন সংস্থার ২০টিরও বেশি প্রকল্প চলমান রয়েছে। তবে এসব প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে গবেষণা ও নতুনত্ব না থাকায় মানুষের টেকসই উন্নয়ন হচ্ছে না। এনজিওগুলোর পক্ষ থেকে চরাঞ্চলে সচেতনতামূলক কাজ হলেও অবকাঠামোগত কাজ তেমন হয়নি। 

পাউবো সূত্রে জানা যায়, বর্ষায় ফুঁসে ওঠা তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা স্বরূপ হারিয়ে শুষ্ক মৌসুমে পরিণত হয় মরা খালে। পলি বহন করতে গিয়ে দীর্ঘতম ব্রহ্মপুত্র নদের অস্তিত্বই প্রায় বিপন্ন। দ্বিগুণ হয়ে এলাকাভেদে ব্রহ্মপুত্রের প্রস্থ ঠেকেছে ১৬ থেকে ১৮ কিলোমিটারে। তবে বছরে সাড়ে ৭২ কোটি মেট্রিকটন পলি বহন করতে গিয়ে কমেছে গভীরতাও। শত শত চর-দ্বীপচর জেগে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য চ্যানেল। নদীর নাব্যতা হারানোয় সংকটে পড়ে গেছে নদীনির্ভর লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা। পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে ব্রহ্মপুত্র নদের প্রস্থ কমানোর চিন্তার কথা জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাফিজুল হক। 

জানা যায়, ১৯৩৮ সালে গাইবান্ধার তিস্তামুখ-বাহাদুরাবাদ রুটে ফেরি চলাচল শুরু হলে সময় ও খরচ বাঁচাতে নৌপথে যাতায়াত করত ৮ জেলার মানুষ। পরবর্তীতে নাব্যতা সংকটের কারণে বালাসীতে ঘাট স্থানান্তর করা হলেও একই কারণে ২০০৪ সালে বন্ধ হয় বালাসী-বাহাদুরাবাদ নৌরুটে ফেরি ও লঞ্চ সার্ভিস। গাইবান্ধার ফুলছড়ি অংশে ব্রহ্মপুত্র নদ। চাষাবাদে সহযোগী হলেও পানিশূন্য প্রায় ব্রহ্মপুত্রে চলছে ঘোড়ার গাড়ি। 

অভ্যন্তরীণ নৌরুট বন্ধ হওয়ার পর পানির অভাবে ঠেলেঠুলে চলছে আন্তঃ জেলা রুটের কয়েকটি নৌকা। যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে সংকটাপন্ন কৃষি, জীববৈচিত্র্য আর জীবন-জীবিকা। শুধু ব্রহ্মপুত্র নয়, জেলার নদীগুলোর সবই নাব্যতা হারিয়ে এখন প্রাণহীন। নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ার ফলে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনাবেষ্টিত গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সদর, সাঘাটা এ চার উপজেলার বিভিন্ন স্থানে প্রতি বছর দেখা দিচ্ছে নদীভাঙন। 

এ আগ্রাসী ভাঙনে ভিটেমাটিসহ সর্বস্ব হারানো বাস্তুচ্যুত মানুষ বলেন, নদীভাঙন প্রতি বছরই তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। নদী কেড়ে নিচ্ছে তাদের সহায়সম্বল। সব হারিয়ে প্রতি বছর নতুন করে নিঃস্ব হচ্ছে নদীপারের মানুষ। আবার বর্ষাও কখনোই বিলাসী কিংবা উপভোগের হয়ে ওঠে না তিস্তা-যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের কোলে। উজানের ঢল আর ঘূর্ণিপাক সরাসরি আঘাত হানে খেটে খাওয়া মানুষের জঠরে। ফুল-ফল-ফসলের ক্ষেত ভাসিয়ে কেড়ে নেয় মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও। কূল-কিনারা হারিয়ে কচুরিপানার মতো ভেসে বেড়ায় তারা। 

জরিপ সমন্বয় করে দেখা যায়, গাইবান্ধায় নদীতীর ও চরাঞ্চলের প্রায় অর্ধ লক্ষ মানুষ প্রতি বছর ছোট-বড় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর নদীভাঙনে বসতভিটা ও জমিজমা হারিয়ে নিঃস্ব হয় গড়ে অন্তত ৪ হাজার পরিবার।

গাইবান্ধা জেলা বার এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও জলবায়ু পরিষদের জেলা আহ্বায়ক জিএসএম আলমগীর বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জীবন, স্বাস্থ্য, খাদ্য, উন্নয়ন, আত্মনিয়ন্ত্রণ, পানি ও স্যানিটেশন, কর্ম, পর্যাপ্ত বাসস্থান ও সহিংসতা, যৌন নির্যাতন, পাচার এবং অন্যান্য অধিকারসহ মানবাধিকার নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত ও লঙ্ঘিত হচ্ছে এখানকার চরাঞ্চলে। 

ফুলছড়ি উপজেলার ফজলুপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আবু হানিফ প্রামাণিক বলেন, বন্যা ও নদীভাঙনে স্থায়ী পদেক্ষপ না নিলে চরের সমস্যা সমাধান করা কঠিন। 

তিনি বলেন, চরের মানুষের জন্য চরের বসতবাড়ি উঁচু করে বন্যাকালীন থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। 

এদিকে বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের জীবনমান উন্নয়ন প্রসঙ্গে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক মো. অলিউর রহমান বলেন, চরাঞ্চলের মানুষজন এখন উন্নয়নের পথেই হাঁটছে। সরকারও এখন চর নিয়ে টেকসই পরিকল্পনা করেছে। ইতিমধ্যে শতাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে আরও উন্নয়ন করতে হবে। 

গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদ হাসান রিপন বলেন, চরাঞ্চলের উন্নয়নে বর্তমান সরকারের বিশেষ দৃষ্টি ও পৃথক পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয়ে তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।  

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


Also News   Subject:  নাব্যতা  







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft