রেল কর্মচারীর ঋণের টাকা আত্মসাৎ, দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন গ্রাহকরা
চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রকাশ: রোববার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩, ১:৪১ পিএম আপডেট: ২৬.০২.২০২৩ ১:৪৩ পিএম

রেলওয়ে ঋণদান সমিতি (সিসিএস) রেলওয়ে কর্মচারীদের বিপদের বন্ধু। বর্তমান বাজারে বেতন দিয়ে চলতে যেয়ে অল্প বেতনের অনেক কর্মচারী হিমশিম খান। তাই বাচ্চাদের পড়ালেখা ও বিবাহশাদী, বড় কোন রোগে-শোকে অতিরিক্ত টাকার প্রয়োজন হলে সাধারণ কর্মচারীরা হয়তো কারো থেকে ঋণ নেন অথবা সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে সমস্যা সমাধান করেন। সে ঋণের টাকা কিস্তির মাধ্যমে ঋণদান সমিতি সিসিএস মাসের বেতন থেকে কর্তন করেন। 

এমনিতেই চলে অল্প বেতনের রেলকর্মচারীদের জীবন। সেই ঋণের টাকা পরিচালকদের কেউ একজন যদি শুভংকরের সুযোগে আত্মসাৎ করে তবে তো অসহায় কর্মচারীদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠে। ডাইরেক্টরদের এমনই একজন ছিলেন সিআরবি রেলওয়ে হাসপাতালের স্টুয়ার্ড ও বাংলাদেশ রেলওয়ে শ্রমিক লীগের একাংশের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ঋণদান সমিতি সিসিএসের সাবেক পরিচালক মো. মিজানুর রহমান। 

একে একে অনেকের ঋণের চেক ভাঙিয়ে টাকা তুলে ঋণগ্রহিতাকে না দিয়ে আত্মসাৎ করেছেন তিনি। অন্যদিকে কোনো ঋণের চেক না নিয়েও বেতন থেকে মাসে মাসে ঋনের কিস্তি বাবদ টাকা গচ্চা দিতে হচ্ছে রেলওয়ের কয়েকজন গ্রাহককে।  

শ্রমিকনেতা মো. মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে রয়েছে প্রতারণার অনেক অভিযোগও। 

চাকরি দেয়ার নামেও অনেকের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে জানা যায়। 

রেলওয়ে হাসপাতালের এক কর্মচারী বলেন, বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তার বিরুদ্ধে নিউজ হলে রেলওয়ে হাসপাতালের ষ্টুয়ার্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকেও অফিস থেকে অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে গত চারমাস যাবত গা ঢাকা দিয়ে রয়েছেন তিনি। তার অফিস রুমে তালা মারা। বন্ধ আছে দীর্ঘদিন। মাসে মাসে বেতন নিচ্ছেন তিনি। কোন অদৃশ্য কারণে উপস্থিত না থেকেও চাকরি চলছে তার।

জানা গেছে, মিজান শ্রমিক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ডাইরেক্টর হওয়ায় সিআরবি, পাহাড়তলী ও লাকসাম সহ রেলওয়ে অঙ্গনে বেশ দাপুটে ছিলেন। হাসপাতালের স্টুয়ার্ড হয়েও তিনি সংগঠনের প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ ও তদবির বাণিজ্য করতেন। 

জানা যায়, মিজানের ভাই বিদেশে যাওয়ার নামে রেলওয়ে শ্রমিকলীগ হবিগঞ্জ শায়েস্তাগঞ্জ শাখার সম্পাদক জোনায়েদ হোসেন নীড়ের পরিবারের কাছ থেকে ধার হিসাবে নেন সাড়ে ২২ লাখ টাকা। টাকা ফেরত না পেয়ে জোনায়েদ রেলওয়ে শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম বরাবর অভিযোগ করেন। পরে মিজান টাকা ফেরত দিবে বলে লিখিত মুচলেকাও দেন। এছাড়া জোনায়েদকে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাড়ে ২২ লাখ টাকার ৫টি চেকও দেন মিজান। কিন্তু ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে গিয়ে জোনায়েদ জানতে পারেন তার অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা নেই। পরে জোনায়েদ হবিগঞ্জ জজ কোর্টে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দুটি মামলা দায়ের করেন। যার নম্বর ২৭৫/২২ ও ৩৭১/২০২২। 

তিনি বলেন, আমার টাকা আত্মসাৎ করায় আজ আমি ও আমার পিতা ক্ষতিগ্রস্থ। আমার বাবার পেনশনের টাকা তাকে ধার দিয়েছে। আজ আমার পরিবার ধ্বংসের মুখে। রেল শ্রমিক লীগের একাংশের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলামের কাছে বিষয়টি সুরাহা করার জন্য গেলে তিনি শুধু মিজানকে কারণ দর্শানো নোটিশ দিয়েছেন। এরপর আর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। 

ভোক্তভোগীদের একজন বলেন, মিজান পরিচালক থাকাকালীন সিআরবি রেলওয়ে হাসপাতালের প্রায় ১৫জন কর্মচারী বাংলাদেশ রেলওয়ে সমবায় ঋণদান (সিসিএস) সমিতির কাছে ঋণের আবেদন করে প্রতারিত হন। ঋণের টাকা অনুমোদিত হওয়ার পর তারা কেউ চেক পাননি। ১৫ জন কর্মচারীর চেকের টাকাই আত্মসাৎ করেন মিজান। অল্প বেতনের কর্মচারীরা তাঁর আত্মসাৎ করা টাকার ঋণের বোঝা টানতে গিয়ে নতুন করে ঋণের ফাঁদে আটকা পড়েছেন। নিজেদের কষ্টে করা মাসিক বেতনও ঠিকমতো পাচ্ছেন না। অসহায়ের মতো ধর্না দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট অফিস ও নেতাদের দ্বারে।

অভিযোগকারী সুত্রে জানা যায়, পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে বাংলাদেশ রেলওয়ে সমবায় ঋণদান (সিসিএস) সমিতির কাছে ২০২১ সালে সাড়ে ৩ লাখ টাকার জন্য আবেদন করেন ষোলশহর সহকারী স্টেশনমাস্টার আল ইয়াসবা আক্তার। ঋণের টাকা অনুমোদিত হয়। অথচ সে জানতে পারেনি। তার মূল বেতন থেকে ব্যাংক ঋণের টাকা কাটতে শুরু করলে সে জানতে পারে, তার ঋণ অনুমোদন হয়েছে। 

ইয়াসবা আক্তার বলেন, পরিচালক মিজানুর রহমান তাঁর ঋণের টাকা তুলে আত্মসাৎ করেছেন। দীর্ঘদিন ঘুরানোর পর অনেক দেনদরবারের পর ভেঙে ভেঙে টাকা দিলেও একলক্ষ টাকা এখনো পাননি। বাকী টাকার জন্য ফোন দিলে গত একবছর মিজান ফোনও ধরেন না। শুধু আল ইয়াসবা নন, রেলওয়ে হাসপাতালের ওয়ার্ডবয় লিটন, পরিচ্ছন্নতা কর্মী ফাল্গুনী দাস, পরিচ্ছন্নতাকর্মী প্রদীপ, মিজানের বন্ধু এক্স-রে অপারেটর ওয়াহিদের টাকাও একইভাবে আত্মসাৎ করা হয়। 

রেলওয়ে থেকে পাওয়া মিজানের বসবাসের বাংলো ৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে বন্ধক দেন মাঈনুদ্দিন ভুইয়া নামে এক লোকের কাছে। অথচ মাইনুদ্দিন ভুইয়া চুক্তির শর্তমতে সেই বাসার ভাড়াটিয়াদের থেকে এখন কোন ভাড়া তুলতে পারেন না। 

তিনি মুঠোফোনে বলেন, মিজান তার দেনাপাওনার কথা বলাতে সরল বিশ্বাসে আমি তার বাংলো বন্ধকের বিনিময়ে ৩০ লাখ টাকা দিয়েছি। প্রথম কয়েকমাসের ভাড়া বাবদ কিছু টাকা উঠলেও এখন আর কোন ভাড়া পাইনা। সে প্রতি মাসের ভাড়া নিয়ে নেয়। এমন প্রতারণার শিকার হবো বুঝতে পারিনি।

সিসিএস সমিতির সচিব মো. সাখাওয়াত হোসেন মুঠোফোনে জবাবদিহিকে বলেন, মিজান যখন ডাইরেক্টর ছিল তখন ডাইরেক্টররা চাইলে ঋণ গ্রহীতার চেক তাদের হাতে দেয়া হতো। এখন সে নিয়ম নেই। বর্তমানে সরাসরি গ্রাহকের টাকা ব্যাংকে জমা হয়। মিজানের বিরুদ্ধে প্রথমে চারজনের অভিযোগ পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। 

ওই কমিটি সমপ্রতি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। সেই ভিত্তিতে সিসিএসের পক্ষ থেকে মামলা প্রস্তুতি চলছে। আরও চারটি অভিযোগ এসেছে খুব শীঘ্রই এই অভিযোগগুলোর রিপোর্ট তদন্ত কমিটি দিবে। যার প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ 

অফিসে তার অনুপস্থিতি সম্পর্কে ডিভিশনাল মেডিকেল অফিসার ডাঃ শিবু নাথ দাস বলেন, সে অসুস্থতার সার্টিফিকেট দেখিয়ে দীর্ঘ সময় ছুটি কাটছে। তবে তার বিষয়ে আমরাও অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়গুলো আমরাও খতিয়ে দেখছি। 

এ বিষয়ে জানতে সাবেক পরিচালক ও রেল শ্রমিক লীগের একাংশের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমানের মুঠোফোনে কয়েকবার ফোন ও মেসেজ দিলেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।

জ/আ

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


Also News   Subject:  চট্টগ্রাম  







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft