
চট্টগ্রাম শহরের বিবিরহাটে কোরবানির পশুর হাট বসেছে। সেই হাটে গেলে হঠাৎ চোখ আটকে যাবে আশপাশের পুরুষ বেপারীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গরুর দেখভাল করছেন এক নারী বেপারী। ক্রেতাদের সঙ্গে গরুর দাম নিয়ে করছেন আলোচনা-দরকষাকষি। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জের সালমা খাতুন এবারের কোরবানি ঈদে বিবিরহাটে গরু নিয়ে আসা একমাত্র নারী বিক্রেতা তিনি।
বুধবার (০৬ জুলাই) বিকেলে সরেজমিনে বিবিরহাটে গিয়ে দেখা যায়, ব্যস্ত সময় কাটছে সালমার। নিজেই তৈরি করছেন নিজ পোষা প্রাণীর খাবার। খাবারের মিশ্রণে সব উপাদান ঠিক আছে কি না, সেদিকে নজরও রাখছেন তিনি। এসব করতে গিয়ে দম ফেলার ফুসরত যেন তার নেই। এতেও গরুর যত্নে যাতে কোনো ত্রুটি না রয়ে যায়, সেজন্য সঙ্গে থাকা কর্মীদের দিচ্ছিলেন বিভিন্ন নির্দেশনা। এভাবেই পরম মমতায় গরুর পরিচর্যা করছিলেন সালমা।
জানা যায়, নারী উদ্যোক্তা সালমার বাড়ি উত্তরবঙ্গে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে। সেখানেই রয়েছে তার খামার। গত দুই বছর ধরে নিজের খামারে গরু পালছেন কিন্তু এই দুই বছরে কোরবানির পশুর হাটে গরু আনেনি তিনি। এবারই প্রথম গরু নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে সোজা চট্টগ্রামের পশুর হাটে এসেছেন সালমা। এবার বিক্রির জন্য সঙ্গে এনেছেন খামারের ১০টি গরু।
তাঁদের এলাকার আরও অনেকে গরু নিয়ে বিবিরহাটে আসেন তাই নিজ এলাকায় বিক্রি না করে এতদূরে গরু নিয়ে এসেছেন। এখানে নাকি বেশ ভালো দামে গরু বিক্রি হয়। তাই অন্যদের সঙ্গে তিনিও গরু নিয়ে এই হাটে এসেছেন। আশা করছেন, ১০টি গরুই বিক্রি করে বাড়ি ফিরতে পারবেন।
সালমা জানালেন, নারী উদ্যোক্তা হওয়া বিশেষত খামারি হওয়ার পথটা সহজ ছিল না তার জন্য। জানালেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ কলেজ থেকে দর্শনে স্নাতক করেছেন। এরপর ভর্তি হন রাজশাহী কলেজে। সেখান থেকে পাশ করেন স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। পড়াশোনা শেষে ২০১৬ সালে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি নেন তিনি। খুব একটা খারাপ চলছিল না। তবে চাকরি জীবনে বড় ধাক্কা খান করোনা মহামারির সময় বাধ্য হয়ে ছাড়তে হয় চাকরি।
ওই সময়ের পরিস্থিতি নিয়ে সালমা বলেন, ‘চাকরি ছাড়লেও ঘরে বসে থাকার মানুষ আমি ছিলাম না। প্রতিনিয়ত ভাবতাম, কী করা যায়। এভাবেই গরুর খামার দেওয়ার চিন্তা মাথায় আসে।’ সেই ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ি। জমানো টাকা দিয়ে একটি গাভী কিনি। শুরুর দিকে দুধ বিক্রি করতাম। দ্রুত বড় হতে থাকে আমান খামার। এক পর্যায়ে ছয় কাঠা জমির ওপর খামার গড়ে তুলি। দুধের পাশাপাশি বিক্রি করতে শুরু করি গরুও। আয় বাড়লে নতুন গরু কিনতে শুরু করি। দুই বছরের মধ্যে এখন তাঁর খামারে রয়েছে ২০টি গরু। লালনপালন করতে করতে গরুগুলোর প্রতি ভীষণ মায়া জন্মে গিয়েছে, এভাবেই বললেন নারী উদ্যোক্তা সালমা।
তিনি আরও বলেন, ‘মাঝে মাঝে মনে হয় এই খামার ছেড়ে অন্য কিছু করি। অবলা পশুগুলোর প্রতি ভালোবাসা জন্মে গিয়েছে তাই ছাড়তে পারি না। এদের মায়ায় জড়িয়ে গেছি। আসলে আমার পক্ষে এখন আর অন্য কিছু করা সম্ভব নয়। এখন এদের নিয়েই থাকব।’
সালমার বিষয়ে বিবিরহাট পশু বাজারের ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের পরিচালক রেজাউল করিম বলেন, বিবিরহাটে আগে কখনো কোনো নারী পশু বিক্রি করতে এসেছেন বলে আমার জানা নেই। এবারের হাটে তিনিই একমাত্র নারী বিক্রেতা। এমনকি চট্টগ্রামের অন্যান্য পশুর হাটে কোন নারী গরু বিক্রি করতে এসেছেন বলেও জানা যায়নি। তাই ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সালমাকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে।
-জ/অ