ভোজ্য তেল, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, মাছ-মাংসসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম রাজধানীর বাজারগুলোতে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। রমজানে গরুর মাংসের দাম কেজিপ্রতি ৫০ টাকা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল কোনো ঘোষণা ছাড়াই। এখনো রাজধানীর বাজারগুলোতে সেই ৭০০ টাকা দামেই বিক্রি হচ্ছে গরুর মাংস।
অন্যদিকে ব্রয়লার মুরগির দাম অপরিবর্তিত থাকলেও সোনালী কেজিতে বেড়েছে ২০ টাকা করে। গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর মিরপুর-২, উত্তর পীরেরবাগ ছাপড়া মসজিদ কাঁচাবাজার ঘুরে এ তথ্য জানা গেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, ঈদ পরবর্তী ঢাকায় ফেরা মানুষের ভিড় বেড়েছে। তার প্রভাব যেন পড়েছে মাংসের দোকানগুলোতে।
শুক্রবার ছুটির দিনে ক্রেতা সমাগম বাড়লেও দাম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা গেছে ক্রেতাদের। কাদের গোশত বিতানে গিয়ে দেখা যায়, সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে মাংস বিক্রি করা হচ্ছে। গরুর মাংস প্রতি কেজি সাতশ টাকা, খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকায়। অন্যদিকে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকায়। বেড়েছে পাকিস্তানি সোনালী মুরগির দাম। ১৫ দিন আগেও ছিল ২৮০ টাকা।
সেই সোনালী মুরগি বিক্রি হতে দেখা যায় ৩০০ টাকায়, লেয়ার ২৭০ টাকা। আর দেশি মুরগি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে। মাংস বিক্রেতা আওয়াল বলছেন, গরুর দাম বেড়েছে। সঙ্গে ঢাকায় আনার খরচাটাও। যার প্রভাব পড়েছে মাংসের দামে।
ঈদ থেকেই গরুর মাংস ৭০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। তবে মুরগির দাম ওঠানামা করছে জানিয়ে এ বিক্রেতা জানান, বৃহস্পতিবার সোনালী মুরগির দাম ছিল কেজি ২৯০ টাকা, শুক্রবার তা ১০ টাকা বেড়ে হয়েছে ৩০০ টাকা। একই দোকানে ডিম ( লেয়ার) প্রতি ডজন পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকায়, খুচরায় তা ১২০ টাকা। দেশি মুরগির ডিম ডজন ১৫০ টাকা এবং হাঁসের ডিম ১৭০ টাকা। ফজলুর রহমান নামে স্যানিটারি মিস্ত্রি মাংস কিনতে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মাংসের দাম আমাদের নাগালের বাইরে যাচ্ছে। যে দাম তাতে আমাদের মতো নিম্ন মধ্যবিত্তের কিনে খাওয়া কঠিন। আগে এক কেজি কিনতাম, আজ আধাকেজি কিনতেও কষ্ট হচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকার তো এসব দেখে না। দোকানদারও জিম্মি। দাম বাড়লে বা কমলে ব্যবসায়ীদের লোকসান হয় না। তবে দাম বাড়লে সাধারণ ক্রেতাদের সমস্যা হয়। অন্যদিকে মাছের বাজারেও যেন গোশতের প্রভাব। প্রতি কেজি মাঝারি আকারের রুই-কাতলা বিক্রি হচ্ছে আকারভেদে ২২০ থেকে ২৫০ টাকায়। তবে ২ কেজিরগুলো আড়াইশ টাকা, ৩ কেজি বেশি ওজনের রুই-কাতলা ২৮০ থেকে সাড়ে তিনশ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মৃগেল ১৮০-২২০ টাকা, ছোট তেলাপিয়া ১৪০ ও বড় ১৮০-২০০ টাকা, বড় সিলভার কাপ মাছের দাম ১৬০-১৯০ টাকা। আইড় ৪০০-৬০০ টাকা। সরপুটি ১৫০-২৫০ টাকা, মলা ২৫০-৩০০ টাকা, পাবদা ৩৫০-৪০০ টাকা, শিং ৩৮০-৫০০, দেশি মাগুর ৪০০-৫০০ টাকা, পাঙ্গাশ ১৬০-২০০ টাকা, চাষের কৈ ২০০-২৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়াও ছোট সাইজের ইলিশ ৮০০ টাকা, কেজির ওপরে ওজন এমন ইলিশ পিস প্রতি দাম হাঁকানো হচ্ছে ১৮০০ টাকা।
গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ব্যবসায়ীরা দেশি রসুনের কেজি বিক্রি করছেন ৯০ থেকে ১০০ টাকা, যা একদিন আগেই ছিল ৪০ থেকে ৫০ টাকা। কয়েকদিন আগে ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি বিক্রি হওয়া আমদানি করা রসুনের দাম বেড়ে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা হয়েছে।
রসুনের দামের বিষয়ে মালিবাগ হাজীপাড়ার ব্যবসায়ী মো. শরাফত আলী বলেন, পাইকারিতে রসুরের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। বৃহস্পতিবার আমরা দেশি রসুন ৪৫ টাকা কেজি বিক্রি করেছি। আজ আমাদেরই কিনতে হয়েছে ৮২ টাকা কেজি। ষাটোর্ধ্ব এই ব্যবসায়ী বলেন, তেলের দাম বাড়ার পর এখন এক এক করে সব কিছুর দাম বাড়ছে।
মানুষ এখন খাবে কী? দাম বাড়া দেখে আমরাই অবাক। আমাদেরও সংসার আছে। এই ব্যবসা করে সংসার চালায়। এখন সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। রসুনের দাম বাড়ার বিষয়ে কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন বলেন, এখন বাজারে দেশি রসুনের সরবরাহ অনেক কম। এ কারণে দেশি রসুনের দাম বেড়ে গেছে। এই পরিস্থিতি থাকলে সামনে রসুনের দাম আরও বাড়তে পারে।
এদিকে গত মাসে ইন্দোনেশিয়া পাম অয়েল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার পর অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে ভোজ্য তেলের দাম। ঈদের আগেই খুচরায় সয়াবিন তেলের কেজি ২০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। সেই সঙ্গে বাজারে সয়াবিন তেলের সরবরাহ প্রায় নেই হয়ে যায়।
পরবর্তীতে ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ভোজ্যতেলের দাম বাড়ায়া এতে বাজারে সয়াবিন তেল আসতে শুরু করে। দাম বাড়ানোর পর দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে অভিযান। এতে মজুত থাকা বিপুল পরিমাণ সয়াবিন তেল উদ্ধার করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এতে বাজারে এখন ভোজ্য তেলের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। তবে দাম কমেনি। খুচরা পর্যায়ে খোলা সয়াবিন তেলের কেজি বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ২৫০ টাকা। পাম অয়েলের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৯৫ থেকে ২০০ টাকা। আর বোতলের পাঁচ লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৯৮০ থেকে ৯৮৫ টাকা। ভোজ্য তেলের মতো বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে পেঁয়াজ। ঈদের আগে ২৫ থেকে ৩০ টাকা বিক্রি হওয়া পেঁয়াজের দাম ঈদের পর কয়েক দফা বেড়ে এখন ৪৫ থেকে ৫০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া সবজির বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আগের মতো ব্যবসায়ীরা বেগুনের কেজি বিক্রি করছেন ৫০ থেকে ৭০ টাকা। শসার কেজি বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ টাকা। লাউয়ের পিস বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। বরবটিও আগের মত ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। তবে পাকা টমেটোর দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে।
ঈদের আগে ২০ থেকে ২৫ টাকা কেজি বিক্রি হওয়া টমেটো এখন ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দাম বাড়ার এ তালিকায় রয়েছে কাঁচা কলা ও পেঁপে। ৩০ টাকা কেজি বিক্রি হওয়া পেঁপে এখন ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। আর ৩০ টাকার কাঁচা কলার হালি বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা।