প্রকাশ: রোববার, ৮ মে, ২০২২, ৯:৪১ পিএম

আমাদের দেশে রান্নার কাজে এক সময় সরিষার তেল সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হলেও সেই স্থান দখল করে নিয়েছে সয়াবিন তেল। তবে সম্প্রতি বাজরে সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধি হওয়ায় ফের কদর বাড়ছে সরিষা তেলের।
স্বাস্থ্যসম্মত ও সয়াবিন তেলের তুলানয় সরিষা তেল পরিমাণে কম খচর হওয়ায় ক্রেতারা এখন ঝুকছেন সরিষা তেলের দিকে। এখন অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে- কোন তেল ব্যবহারে উপকার বেশি বা পুষ্টি বেশি পাওয়া যায়? এ বিষয়ে পুষ্টিবিদরা বলছেন, আমাদের দেশে যত ধরনের ভোজ্যতেল ব্যবহার হয় তার মধ্যে সবচেয়ে ভালো সরিষার তেল। সয়াবিন তেলে অনেক সময় অসাধু ব্যবসায়ীরা পাম অয়েলসহ বিভিন্ন কিছু মেশায়। অধিক মুনাফার জন্য তারা এ কাজ করে। কিন্তু সরিষার তেলে সে সুযোগ নেই। কারণ সরিষার তেলে এমন কিছু মেশালে ভালোভাবে মিক্সড হয় না। এ কারণে সরিষার তেল তুলনামূলক ভালো। এমন কী সানফ্লাওয়ার তেলের সঙ্গেও অন্য তেল মেশানো যায়। ফলে সরিষা তেলের ব্যবহার অনেকটাই নিরাপদ।
পুষ্টিবিদরা বলেন, আমাদের দেশে তেল-মসলা বেশি খাওয়া হয়। এ জন্য সয়াবিন তেল ব্যবহার করা হয়। চাইলে সরিষাবাটা তেল দিয়েও রান্না করা যায়। সরিষার তেল সয়াবিন তেলের চেয়ে বরং পরিমাণে কম লাগে। এতে শরীরে ক্যালরি বাড়ার আশঙ্কাও কমে যায়। যেসব তেল একই সঙ্গে রান্না ও চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে সরিষার তেল অন্যতম। এ তেলের সুগন্ধ রান্নার স্বাদ বাড়ায়। এতে থাকা স্বাস্থ্যকর ফ্যাট শরীরের নানা উপকার করে। এক সময় রান্নার জন্য এ তেল প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এখন তা সীমিত রান্নায় ব্যবহৃত হয়।
আয়ুর্বেদ চিকিৎসায় বলা হয়, রান্নায় নিয়মিত সরিষার তেল ব্যবহার করলে দারুণ সব উপকার পাওয়া যায়। যেমন- গোটা বিশ্বে হৃদরোগজনিত জটিলতায় সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, সরিষার তেলে থাকা মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। সেই সঙ্গে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, সরিষার তেলে থাকা ওমেগা থ্রি পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। এ ছাড়া এ তেলে তৈরি রান্না খেলে শতকরা ৫০ ভাগ টিউমারের আশঙ্কা কমে যায়। সরিষার তেলে থাকা অ্যালিল আইসোথিয়োকানেট উপাদান মূত্রাশয়ে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা ৩৪ ভাগ কমিয়ে দেয়। সরিষার তেলে থাকা অ্যান্টিবমাইক্রোবিয়াল উপাদান হজমশক্তি উন্নত করে। সেই সঙ্গে দাঁতের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে। প্রদাহজনিত সমস্যা কমাতে সরিষার তেলের জুড়ি নেই। সরিষার তেলে কোলেস্টেরলের পরিমাণ কম থাকায় এটি ওজন কমাতেও দারুণ ভূমিকা রাখে। এক চা-চামচ সরিষার তেলে আছে ১২৬ ক্যালরি। এছাড়া সরিষার তেল অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিফাঙ্গাল উপাদানসমৃদ্ধ। ত্বকের ওপর এই তেল দিয়ে ম্যাসাজ করলে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন দূর হয়। এরা ফাঙ্গাসের বৃদ্ধি রোধ করে।
বাংলাদেশের বাজারে সয়াবিন তেল নিয়ে নানা তেলেসমাতি দেখা যাচ্ছে গত দুই সপ্তাহ ধরে। বাজারে দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে ভোজ্যতেল হিসেবে ব্যবহৃত এই তেল। সরকার নির্ধারিত টাকার থেকেও বেশি টাকা দিয়েও মিলছে সয়াবিন তেল। কিন্তু সরিষার তেল বাংলাদেশের ঐতিহ্যের সঙ্গেই মিশে আছে। একসময় গ্রামবাংলার একমাত্র ভোজ্যতেল ছিল সরিষার তেল। সরিষার তেল যেমন প্রয়োজনীয় তেমন উপকারীও। ভারতীয় উপমহাদেশে খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ থেকে সরিষার ব্যবহার হয়ে আসছে।
সরিষার তেলের ব্যবহার দিন দিন কমে গেলেও সয়াবিন তেলের কারসাজিতে ফের কদর বেড়েছে এ তেলের। অনেক রাঁধুনীরা বলছেন, সরিষা তেল শুধু স্বাস্থ্যসম্মতই নয় দামেও অনেক কম। কারণ বাজারে সয়াবিন তেলের চেয়ে সরিষা তেলের দাম কিছুটা বেশি হলেও রান্নায় এর ব্যবহার করতে হয় সয়াবিনের তুলনায় খুবই কম। সয়াবিন তেলের তিন ভাগের এক ভাগ ব্যবহারই যথেষ্ঠ। অর্থাৎ কারও পরিবারে যদি ৬ লিটার সয়াবিন তেল লাগে তাহলে সেই পরিবারে সরিষা তেল ব্যবহার করলে লাগবে মাত্র ২ লিটার।
বাজরে বর্তমানে প্রকার ভেদে ১৯০ থেকে ২৪০ টাকায় সরিষা তেল কিনতে পাওয়া যাচ্ছে। তাহলে বর্তমান বাজার মূল্যে ৬ লিটার সয়াবিন তেলের মূল্য প্রায় ১২০০ টাকা। এর পরিবর্তে সরিষা তেলের ব্যবহার করলে ৫০০ টাকাও খরচ হচ্ছে না। পাশাপাশি যদি কেউ এর চেয়ে একটু বেশি মাত্রায় ব্যবহার করতে চান তাও ৭৫০ টাকার বেশি খরচ হওয়ার কথা নয়। রান্নায় অনেকেই সরিষা তেল খেতে অভ্যস্ত নয় এ কারণে অনেকের কাছে বিস্বাদও লাগতে পারে। তবে এর কারণ হচ্ছে ব্যবহার বিধি। যদি কেউ সঠিক মাত্রায় অর্থাৎ সয়াবিন তেলের তিন ভাগের এক ভাগ ব্যবহার করেন, তাহলে স্বাদ নষ্ট হবে না। ফলে সয়াবিন তেলের তেলেসমতি থেকেও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে উচিৎ শিক্ষা দিতে আমরা স্বাস্থ্যসম্মত সরিষা তেলের ব্যবহার বাড়িয়েই দিতে পারি।