ওয়াসার সাড়ে ৫শ’ কোটি টাকা আত্মসাৎ
পারবে তো দুদক?
খালেদ মাহমুদ রকি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ মে, ২০২৩, ১২:৪৮ পিএম আপডেট: ০৯.০৫.২০২৩ ১২:৫৩ পিএম

প্রায় সাড়ে ৫’শ কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযুক্ত ঢাকা ওয়াসার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং (ডিডাব্লিউএসএনআইপি) প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী আক্তারুজ্জামান বিদেশে পালিয়ে যওয়ার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। 

সম্প্রতি দুদক তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ আমলে নিয়ে মামলার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। দুর্নীতি পাহাড়সম। যার বিরুদ্ধে অভিযোগতার কোন মাথা ব্যাথা নেই। এসব যেন তুচ্ছ ঘটনা। 

ওয়াসার ঊর্ধ্বতন সূত্র জানায়, দুদকে অভিযোগ পড়েছে ঠিকই কিন্তু দুদক পারবে তো?

জানা গেছে, ঢাকা ওয়াসার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং (ডিডাব্লিউএসএনআইপি) প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী আক্তারুজ্জামানের বিরুদ্ধে রিহ্যাবিরিটেশন অব ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক ফর ডাব্লিউ রিডাকশন কাজের আইসিবি-০২-১০ প্রকল্পের কাজে চল্লিশ কোটি টাকা ঘুষ নিয়ে প্রথম সর্বনিম্ন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠিান হুবেই ইন্ডাস্ট্রিয়াল কনস্ট্রাকশন কোং লিমিটেড (এইচআইসিসিকে বাদ দিয়ে তৃতীয় সর্বনিম্ন প্রতিষ্ঠান সিসিএসইবি-আরপিএল জেভি- কে কাজ দেয়া, গুলশান, বারিধারা লেক দূষণ মুক্ত করণ প্রকল্পের ৫০ কোটি টাকা প্রকল্পের কাজ না করে পুরো টাকা আত্মসাৎ করা ঢাকা ওয়াসা কর্মচারি বহুমুখী সমিতির সভাপতি হিসেবে সমিতির ৪৪৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদকে) আবেদনও করা হয়েছে। 

ওই আবেদন পত্রের সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা ওয়াসার অতিঃ প্রধান প্রকৌশলী এবং (ডিডাব্লিউএসএনআইপি) প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আক্তারুজ্জামান দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন উপায়ে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিলাসবহুল ফ্লাট, প্লট, গাড়ি পেট্রোলপাম্প সহ গড়েছেন সমএদও পাহাড়। 

এছাড়া দেশের বাইরে মালেশিয়ায় সেকেন্ড হোম এবং কানাডার টরেন্টো শহরে বেগম পাড়ায় তার বাড়ি আছে বলে উল্লেখ রয়েছে আবেদনে।

ঢাকা ওয়াসার (ডিডাব্লিউএসএনআইপি)  প্রকল্পের আইসিবি ০২.১০ প্যাকেজের জন্য ২০১৭ সালে টেন্ডার আহবান করা হলে ১০টি দেশী বিদেশী প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। কারিগরি মূল্যায়নে ৬ টি প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে বাকি ৪টি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক মূল্যায়ন করা হয়। 

এতে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়, হুবেই ইন্ডাস্ট্রিয়াল কনস্ট্রাকশন কোং লিমিটেড (এইচআইসিসি) দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা হয়, চায়না ফার্স্ট মেটালার্জিক্যাল গ্রুপ কোং লি. এ্যান্ড সিএসএডিআই জেভি, তৃতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা হয়, চায়না কনস্ট্রাকশন সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুরো লি. এ্যান্ড আরএফএল জেভি, প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতা চেয়ে তৃতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা দর ৪০ কোটি টাকার বেশি ছিল। 

এছাড়াও তৃতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা এধরনের কাজের কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় ইতিপূর্বে আইসিবি-০২.০৮ এবং আইসিবি-০২-০৯ প্যাকেজের টেন্ডারে এই প্রতিষ্ঠানকে নন রেসপনসিভ করা হয়। নগদ ৫ কোটি টাকার বিনিময়ে আখতারুজ্জামান ওই প্রতিষ্ঠানকে কারিগরি মূল্যায়নের রেসপনসিভ করা হয়। 

এসব অনিয়মের এবং দুর্নীতির বিষয়গুলো জানার পর ২০২০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ওই প্রস্তাবকে বাতিল করে দেয়। কিন্তু পরবর্তীতে অর্থমন্ত্রী বিদেশে থাকার বিষয়টি কাজে লাগিয়ে কৌশলে ক্রয় সংক্রান্ত কমিটির ভার্চুয়াল মিটিং-এ তৃতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা কে কাজ দেয়ার বিষয়টি অনুমোদিত হয় বলে জানা গেছে। 

এছাড়া গুলশান-বারিধারা লেকের দূষণ রোধের জন্য প্রায় ৫০ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করেছিল ঢাকা ওয়াসা। কিন্তু ওই প্রকল্পের পঞ্চাশ কোটি টাকা খরচ করা হলেও বাস্তবে গুলশান-বারিধারা লেকের দূষণ রোধ হয়নি। 

এ বিষয়ে ১০ম জাতীয় সংসদের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির ১১তম বৈঠকে গুলশান-বারিধারা দূষণমুক্ত প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হয়। 

পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার বিভাগের তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যাহত তথা সরকারের আর্থিক ক্ষতি সাধনের দায় প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের পূর্বক ব্যবস্থা নিয়ে এক মাসের মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগকে অবহিত করার জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ হতে ২০১৬ সালের ২৮ নভেম্বর ঢাকা ওয়াসার নিকট পত্র প্রেরণ করে। 

এছাড়াও প্রকৌশলী আখতারুজ্জামানকে ৪ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে পদোন্নতি দেয়ার অভিযোগ আছে ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। যা ঢাকা ওয়াসার ইতিহাসে বিরল। প্রকৌশলী আক্তারুজ্জামান বর্তমানে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং এডিবির অর্থায়ন ১ টি বড় প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন বলে জানা গেছে। 

ঢাকা ওয়াসার বিভিন্ন রাজস্ব জনের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে পিপিআই কি প্রোগ্রাম ফর পারফরম্যান্স ইমপ্রুভমেন্ট এর আওতায় ঢাকা ওয়াসা কর্মচারী বহুমুখী সমিতির মাধ্যমে আদায় হয়ে আসছিল। 

নিয়ম অনুযায়ী সমিতির সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে সমিতির চেয়ারম্যান, সাধারণ সম্পাদক, কোষাধক্ষ্য ও অন্যান্য পদে নির্বাচিত ব্যক্তিদের দ্বারা ঢাকা ওয়াসা কর্মচারী সমিতি তথা পিপিআই এর কার্যক্রম পরিচালনা হওয়ার কথা। কিন্তু ২০১৯ সালের শুরুর দিকে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান এর ১টি অবৈধ অফিস আদেশের মাধ্যমে প্রকৌশলী আখতারুজ্জামান ঢাকা ওয়াসার কর্মচারী সমিতির তথা পিপিআই এর চেয়ারম্যান হন। 

এরপর পিপিআইয়ের একাউন্ট হতে বিভিন্ন সময় বিপুল পরিমাণ অর্থ অন্যান্য নামসর্বস্ব একাউন্টে স্থানান্তর করার মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয় বলে ওই আবেদন পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা ওয়াসার কোনও কর্মকর্তা প্রকাশ্যে কোনও মন্ত্যব্য করতে রাজি হননি। 

তবে নাম পরিচয় গোপন রাখার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা দৈনিক জবাবদিহিকে বলেন, প্রকৌশলী আখতারুজ্জমান ক্ষমতাধর হওয়ায় ভয়ে প্রকাশে কেউ মুখ খোলে না। 

তবে, দুদককে বিষয়টি অবগত করার পর থেকেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আখতারুজ্জামানকে ৬ মাসের ছুটি দিয়েছিল। কিন্তু তার চাকরির মেয়াদও তখন ৬ মাস বাকী ছিল। পরবর্তীতে বিষয়টি জানাজানি হলে ছুটি বাতিল করে। যদিও তিনি এখনও অফিসে আসেন না।  

ইতোমধ্যেই তিনি বিদেশে পালিয়ে যেতে চেষ্টা করছেন বলে জানতি পেরেছি। 

এ কর্মকর্তারা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, দুদকে অভেযোগ করার পরও এতবড় দুর্নীতিবাজ যদি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায় তাহলে খুবই দুঃখ্যজনক।

এ প্রসঙ্গে প্রকৌশলী আখতারুজ্জমান বলেন, সমিতির টাকা আগের সভাপতির সময়ে দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হলেও দোষারোপ করা হচ্ছে আমাকে। 

এছাড়া বিদেশে পালিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি কোনও দেশেই পালিয়ে যাব না, আমি দেশেই থাকব। 

ছুটির বিষয়ে বলেন, আমি ছুটিতে নেই, অফিসে না গেলেও অফিসের কাজেই ব্যস্ত আছি।

এ বিষয়ে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১ এর উপ-পরিচালক এস এম এম আখতার হামিদ ভূঞা বলেন, ওয়াসার প্রকৌশলী আখতারুজ্জানের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ আমলে নেয়া হয়েছে। এখন মামলার প্রস্তুতি চলছে। এটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

জ/আ

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


Also News   Subject:  ওয়াসা  







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft