
ভোলা সদরের ব্যাংকেরহাট বাজারের একটি বন্ধ দোকানের সামনে উদাস হয়ে বসে আছেন একসময়ের জনপ্রিয় স্থানীয় বাউল শিল্পী রফিক বয়াতি। দিনকাল কেমন যাচ্ছে, জিজ্ঞেস করতেই রফিক বয়াতির কণ্ঠে হতাশার ছাপ শোনা গেল।
রফিক বয়াতি বললেন, ‘কেমন আর যাইব? রোজার মাস, বায়নাপত্র, কাজকর্ম নাই। পোলাইনেরও কাম নাই। কেমন যাইব বোঝেন নাহ্?’ রফিক বয়াতির আসল নাম মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশ বেতারের (খুলনা) তালিকাভুক্ত সংগীতশিল্পী।
ভোলার মানুষের কাছে রফিক বয়াতি বেশ পরিচিত মুখ। তিনি আধ্যাত্মিক ও ভক্তিমূলক গান করেন। একসময় ভোলা-বরিশাল, লক্ষ্মীপুর-নোয়াখালীর মঞ্চে জনপ্রিয় ছিলেন এই শিল্পী।
তবে করোনা মহামারির পর থেকে জলসা আর গানের আসরের আয়োজন কমতে শুরু করেছে। সঙ্গে চাহিদা কমেছে রফিক বয়াতির। এখন আর রফিক বয়াতিকে তেমন কেউ গান গাইতে ডাকেন না।
তাই আয়রোজগারও নেই তাঁর। সব মিলিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন তিনি। এরমধ্যে ঈদ দরজায় কড়া নাড়লেও এ উপলক্ষে বিশেষ কোনো কেনাকাটা নেই রফিক বয়াতির। তাই ঈদ নিয়েও তাঁর মাথাব্যথা নেই।
জানতে চাইলে রফিক বয়াতি বলেন, ‘এহন আর আগের মতো কেউ আর গান গাইতে ডাকে না। তাই সংসারে আয় নাই বললেই চলে। আমার একমাত্র কাজই হলো গান গাওয়া। আর অন্য কোনো আয় নেই।
করোনার পর থেকে কেউ আর অনুষ্ঠানে গান গাইতে ডাকে না। বাংলাদেশ বেতার, সরকারি-বেসরকারি অনুষ্ঠান থেকেও ডাক আসে না। যাঁরা জলসা করতেন, চান্দাপাতি তুইলা জলসা করতেন।
লোকজন আজকাল চাঁদাও দেয় না, অনুষ্ঠানও হয় না। মাঝেমধ্যে দুই-একজন গান শুনতে ডাকেন, দুই-এক শ টাকা দেন। কিন্তু রোজার মাসে তা-ও বন্ধ।’
সদর উপজেলার ভেদুরিয়া ইউনিয়নের হেতনারহাট এলাকায় চর ভেদুরিয়া গ্রামে রফিক বয়াতির বাড়ি। বেশির ভাগ সময় তিনি বাড়ির আশপাশেই থাকেন।
মাঝেমধ্যে ব্যাংকেরহাটে আসেন। দূর থেকে দেখা হলে লম্বা করে সালাম দেন। পান খাওয়া মুখে মিষ্টি হাসি দেন। আগে যখন রফিক বয়াতি নিয়মিত গানবাজনা করতেন, তখন সব সময় তাঁর কাঁধে ঝুলে থাকত দোতারা।
আর পাশে থাকতেন দুই-তিনজন বাজনদার। প্রতিবছর জ্যৈষ্ঠ মাসে রফিক বয়াতির বাড়ির উঠানেই জলসা বসত। সেখানে ভোলার বিভিন্ন উপজেলাসহ আশপাশের জেলা থেকে বাউলেরা আসতেন। সারা রাত গানের আসর থাকত। ভক্ত-শ্রোতারা সারা রাত গানে বুঁদ হয়ে থাকতেন। সেই জলসাও এখন বন্ধ হয়ে গেছে।
রফিক বয়াতি বলেন, ‘গরিবের দুঃহের শ্যাষ নাই। আমার বাহে (বাবা) আছিল, এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। আমি হ্যার একমাত্র পুত। হে (বাবা) যে সম্পত্তি থুইয়া গেছিল, হের বেশির ভাগ তেঁতুলিয়া নদীত ভাইঙা লোই গেছে। এহোন খাইয়া, না খাইয়া জীবন যায়।’
ভোলার কয়েকজন গরিব-অসহায় বয়াতিকে ভোলা জেলা শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে বাৎসরিক অনুদান দেয়া হতো। এতে বছরে ১৪ হাজার ৫০০ টাকা পেতেন রফিক বয়াতি।
কিন্তু করোনার পর থেকে তা-ও বন্ধ আছে। একসময় জেলা তথ্য অফিস থেকেও সচেতনতামূলক গান গাওয়া বাবদ মাসে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পেতেন।
তবে এখন সেই আয়ের পথও বন্ধ। রফিক বয়াতির বাবা হাবিবুর রহমান মোল্লাও গান গাইতেন। ছিলেন চট্টগ্রাম ফটিকছড়ি মাইজভান্ডারী শরিফের ভক্ত।
রফিক বয়াতির বাবার রেখে যাওয়া খানকা শরিফ কতবার যে তেঁতুলিয়া নদীতে ভেঙেছে, তার হিসাব নেই। খানকার সঙ্গে রফিক বয়াতির বসতবাড়িও ভেঙেছে। রফিক বয়াতির দুই ছেলে ও তিন মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন।
এক ছেলে মুনসুর হেলাল এইচএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। তবে তিনি চর্মরোগের কারণে বাড়িতেই থাকেন। উচ্চশিক্ষা বা চাকরি—কোনোটাই করা হয়নি। আরেক ছেলে বিল্লাল হোসেন হলেন ঢুলি। বিল্লাল তাঁর বাবার সঙ্গে ঢোল বাজান।
তবে গানবাজনার ফাঁকে দিনমজুরের কাজও করেন। এত কষ্ট নিয়ে পথ চলতে চলতে কিছুদিন আগে বেখেয়ালি রফিক বয়াতি একবার দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন। তবে মাথায় তীব্র আঘাত পান। আঘাতের ঘা শুকিয়েছে।
তবে রফিকের ধারণা, পরিপূর্ণ সুস্থতা আসেনি। টাকার অভাবে উন্নত চিকিৎসাও করাতে পারছেন না।
ভেদুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও ব্যাংকেরহাট হাইস্কুলের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তাজুল ইসলাম বলেন, রফিক বয়াতির বাবা হাবিবুর রহমান মোল্লা ১৯৭৩ সালে এই ইউপির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি বেশ জনপ্রিয় ও সৎ মানুষ ছিলেন।
তবে সামান্য কিছু সম্পত্তি ছাড়া ছেলের জন্য তেমন কিছুই রেখে যাননি। যা রেখে গেছেন, তা-ও নদীভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে।
জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার তানভীর রহমান বলেন, এর আগে মন্ত্রণালয় থেকে আসা টাকা তাঁরা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে অসহায় বয়াতিদের কাছে পৌঁছে দিতেন। তবে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে যখন থেকে টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, তারপরের খবর আর তিনি জানেন না।
জেলা প্রশাসক মো. তৌফিক ই-লাহী চৌধুরী বলেন, রফিক বয়াতিকে ডেকে নিয়ে তাঁর সমস্যার কথা শুনে সাহায্যের ব্যবস্থা করা হবে।