ঢাকা-টোকিও’র মধ্যে ৮টি চুক্তি স্বাক্ষরিত
‘বাংলাদেশের জনগণের হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছে জাপান’
প্রকাশ: বুধবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৩, ৭:২৭ পিএম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জাপান বাংলাদেশের জনগণের হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। যে কয়েকটি দেশ ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে দ্রুত স্বীকৃতি দিয়েছিল জাপান তাদের মধ্যে একটি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ-জাপান বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ‘ব্যাপক অংশীদারিত্ব’ থেকে সফলভাবে ‘কৌশলগত অংশীদারিত্বে’ পৌঁছেছে।

তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী কিসিদা এবং আমি আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আদ্যপান্ত আলোচনা করেছি। আমরা খুব খুশী যে, আমরা বাংলাদেশ-জাপান বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পকর্কে ‘ব্যাপক অংশীদারিত্ব’ থেকে ‘কৌশলগত অংশীদারিত্বে পৌঁছাতে পেরেছি।’

জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিসিদার কার্যালয়ে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর বিনিময় প্রত্যক্ষ করার পর যৌথ বিবৃতি প্রদানের পর এই মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি আরো বলেন, ‘আজ, প্রধানমন্ত্রী কিসিদা এবং আমি ‘কৌশলগত অংশীদারিত্বের’ ওপর যৌথ বিবৃতি প্রদান করেছি। আমি বিশ্বাস করি যে, আমাদের দু' দেশের জনগণ ও সরকারের মধ্যে বিদ্যমান চমৎকার বোঝাপড়া, বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা সামনের দিনগুলোতে আরো জোরদার হবে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের দুই পক্ষ কৃষি, শুল্ক সংক্রান্ত, প্রতিরক্ষা, তথ্য-প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, শিল্পোন্নোয়ন, মেধা সম্পদ, জাহাজ রিসাইক্লিং, এবং মেট্রোরেল বিষয়ে যেসব চুক্তি এবং সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে,ভবিষ্যত সহযোগিতার ক্ষেত্রে তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে।’

দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে উভয় পক্ষ রোহিঙ্গা ইস্যুর পাশাপাশি মহেশখালি-মাতারবাড়ি সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন উদ্যোগ (এমআইডিআই) এবং বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট (বিগ-বি) অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, তাঁরা অতিরিক্ত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির কারণে স্থানীয় জনগণের জীবন ও জীবিকার মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান খুঁজে বের করতে তাদের যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনার জন্য জাপানকে অনুরোধ জানিয়েছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলতি বছরেই ঢাকা-নারিতা সরাসরি বিমান চলাচল শুরু হতে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘চলতি বছরের মধ্যে ঢাকা-নারিতা সরাসরি বিমান চলাচলের ঘোষণা করতে পেরে আমরা খুশী।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁরা  বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে এমআইডিআই ও বিগ-বি উদ্যোগ গ্রহণ এবং বঙ্গোপসাগর ও পাশ্ববর্তী অঞ্চলগুলোর যোগাযোগ স্থাপনের বিষয় নিয়েও আলোচনা করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের বৃহত্তম উন্নয়ন অংশীদার হওয়ায় আমরা জাপান সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। আমরা জাপানের সঙ্গে আগামী দিনগুলোতে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি সম্পন্ন করার অপেক্ষায় আছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার হৃদয় ঘনিষ্ঠ জাপানের মতো একটি সুন্দর দেশে অবস্থান আমার জন্য সব সময় আনন্দের বিষয়।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৫০ বছর সম্পন্ন হওয়ায় পর টোকিওতে সরকারি সফর শুরু করতে পেরে আমি বিশেষভাবে আনন্দিত।’

শেখ হাসিনা বলেন, প্রধানমন্ত্রী কিসিদা এবং জাপান সরকারের আতিথেয়তায় আমি এবং আমার প্রতিনিধিদলের সদস্যরা গভীরভাবে মুগ্ধ।

তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক জাপান সফরের মাধ্যমে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করেছেন।

মহামারি কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ার আগে ২০১৯ সালে সর্বশেষ সফরের পরে তিন বছর পর শেখ হাসিনা জাপান সফর করছেন।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে ১৫ দিনের সরকারি সফরে ২৫ এপ্রিল সকালে ঢাকা ত্যাগ করেন এবং একই দিন স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে টোকিও’র হানেদা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জাপান বিমানবন্দরে লাল গালিচা সংবর্ধনা দিয়ে স্বাগত জানায় এবং গার্ড অব অনার প্রদান করে।

সহযোগিতা জোরদারে ঢাকা ও টোকিও’র মধ্যে ৮টি চুক্তি স্বাক্ষরিত 

ঢাকা ও টোকিও আজ আটটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। কৃষি, মেট্রোরেল, শিল্প উন্নয়ন, জাহাজ রিসাইক্লিং, শুল্ক সংক্রান্ত বিষয়, মেধাসম্পদ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, আইসিটি এবং সাইবার নিরাপত্তা সহযোগিতা বিষয়ে দুই বন্ধুপ্রতীম দেশের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রীদের উপস্থিতিতে 

বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে চুক্তিগুলো বিনিময় করা হয়।

প্রথম চুক্তিটি হলো- বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয় এবং জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কৃষি গবেষণা ও উন্নয়ন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কৃষি সহযোগিতার বিষয়ে একটি সহযোগিতা স্মারক (এমওসি)।

দ্বিতীয় চুক্তিটি হলো- শুল্ক আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে শুল্ক বিষয়ক সহযোগিতা ও পারস্পরিক সহায়তা সংক্রান্ত জাপান সরকার এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে একটি চুক্তি। এর লক্ষ্য শুল্ক অপরাধ প্রতিরোধ, তদন্ত এবং শুল্ক পদ্ধতির সরলীকরণ ও সমন্বয়ের জন্য সহযোগিতামূলক প্রচেষ্টা গ্রহণ করা।

তৃতীয় চুক্তিটি হলো- বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ‘বাংলাদেশ-জাপান ইন্ডাস্ট্রিয়াল আপগ্রেডিং পার্টনারশিপ কোঅপারেশনের ওপর একটি ফ্রেমওয়ার্ক প্রতিষ্ঠার জন্য  যৌথভাবে বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্পের মানোন্নয়নের সম্ভাবনা অন্বেষণ করার জন্য একটি এমওসি। 

২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) অবস্থান থেকে উত্তরণ লাভের জন্য এবং "ভিশন ২০৪১" এর সাথে সঙ্গতি রেখে ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশ হওয়ার চলমান প্রচেষ্টার জন্য বাণিজ্য কর্মক্ষমতা এবং পণ্য বৈচিত্র্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারী ও বেসরকারী উভয় পর্যায়ে জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার।

চতুর্থ চুক্তিটি হলো- প্রতিরক্ষা সংলাপ, সফর বিনিময়, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, কোর্স, সেমিনার, কর্মশালা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং এর সাথে প্রাসঙ্গিক অন্য কোনো সম্মত কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদার করার জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং জাপান সরকারের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সংক্রান্ত স্মারক।

পঞ্চম চুক্তিটি হলো- মেট্রো রেলের ক্ষেত্রে সহযোগিতা, মেট্রো রেল নীতি, আইন ও প্রবিধান বিষয়ে সহযোগিতা, অবকাঠামো, রোলিং স্টক ও সিস্টেমের জন্য প্রযুক্তি; নিরাপত্তা নীতি ও ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে জাপানের ভূমি, অবকাঠামো, পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সহযোগিতা স্মারক।  

ষষ্ঠ চুক্তিটি হলো- জাপানের ভূমি, অবকাঠামো, পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের শিল্প মন্ত্রণালয়ের মধ্যে জাহাজ রিসাইক্লিংয়ের ক্ষেত্রে সহযোগিতা স্মারক। বাংলাদেশী পক্ষ ২০২৩ সালের মধ্যে জাহাজের নিরাপদ ও পরিবেশসম্মতভাবে রিসাইক্লিং করার জন্য হংকং ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন (এইচকেসি) মেনে চলার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জনে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবে।

জাপানি পক্ষ জাহাজ রিসাইক্লিং করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উন্নয়নে সহায়তা প্রদানের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবে। এগুলোর মধ্যে একটি ট্রিটমেন্ট, স্টোরেজ এবং ডিসপোজাল সুবিধা প্রতিষ্ঠা করা এবং এইচকেসি এর বিধানগুলোর শর্ত পূরণে বাংলাদেশকে সহায়তা করা।

তথ্য বিনিময় ও চর্চা, আইপিআরের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, শিল্পের বিকাশ ও উদ্ভাবনের জন্য আইপিআর সিস্টেমের উন্নতির মাধ্যমে মেধাসম্পদ অধিকার (আইপিআর) সিস্টেম ও চর্চার বিষয়ে জাপান  পেটেন্ট অফিস এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পেটেন্ট, ডিজাইন এবং ট্রেডমার্ক বিভাগের মধ্যে সপ্তম সহযোগিতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হয়েছে। 

অষ্টম চুক্তিটি হলো- বাংলাদেশের আইসিটি বিভাগ, ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সাইবার নিরাপত্তাসহ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এমওসি।

কৃষিমন্ত্রী ড. মুহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডেও চেয়ারম্যান (সিনিয়র সচিব) আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনীম, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওয়াকের-উজ-জামান, সড়ক পরিবহন ও জনপথ বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নূরী, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকিয়া সুলতানা এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বাংলাদেশের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

চুক্তি স্বাক্ষরের আগে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও জাপানের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

নিরাপত্তা সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বর্ধিত বাণিজ্য সম্পর্ক, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা ইস্যুসহ সংশ্লিষ্ট পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আলোচনায় প্রাধান্য পায়। 

জ/আ 

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


Also News   Subject:  বাংলাদেশ  







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft