
চাঁপাইনবাবগঞ্জে পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও সাবেক যুবলীগ নেতা খাইরুল আলম জেমকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় জেলা কৃষক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকসহ ৫ আসামীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
সোমবার (২৪ এপ্রিল) বেলা সোয়া ১১টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করে পুলিশ।
অন্যদিকে, এই হত্যায় মূল পরিকল্পনাকারী ও প্রধান আসামিদেরকে আটক না করায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মামলার বাদি ও নিহতের স্বজনরা। তাদের দাবি, রাজনৈতিক দ্বন্দের জের ধরে খাইরুল আলম জেমকে হত্যার মূল পরিকল্পনা করেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মোখলেসুর রহমান।
এছাড়াও সংসদ সদস্য পদে উপনির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি সামিউল হক লিটন, সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদ রানা টিপুসহ প্রভাবশালী আরও কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এই হত্যাকান্ডে। বাদি মনিরুল ইসলাম, সাক্ষী মো. মজিদ ও নিহতের স্বজনরা জানান, এ ঘটনায় পুলিশ শুরু থেকে অসহযোগিতাপূর্ণ আচরণ করছে। মূল পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারীদেরকে এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়ার পায়তারা করছে। এখন পর্যন্ত পুলিশ তাদেরকে আটক করেনি। তারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু পুলিশ তাদের বিষয়ে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
এ বিষয়ে গত শনিবার (২২ এপ্রিল) দিবাগত রাতে মোট ৪৮ জনের নাম উল্লেখ করে সদর মডেল থানায় মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া মামলায় আরও ১৫-২০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। এদিকে, এই ৫ জনকে রবিবার (২৩ এপ্রিল) দিবাগত গভীর রাতে জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা- ডিবি পুলিশ ও থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে আটক করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃত আসামীরা হলেন- জেলা কৃষক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও হত্যা মামলার ০৩ নম্বর আসামী জেলা শহরের মিলকি বাগানপাড়া মহল্লার মৃত আলতাব হোসেনের ছেলে মেসবাহুল হক টুটুল (৪২), তার সহযোগী জেলা শহরের মসজিদপাড়া মহল্লার মৃত মোয়াজ্জেম হোসেনের ছেলে মো. মাসুদ রানা ওরফে রানা (৩৮) মাসুদ রানা, একই এলাকার মৃত আনোয়ার হোসেনের ছেলে মো. ইব্রাহিম ওরফে দাউদ ইব্রাহিম ওরফে হাবা (৩২), হুজরাপুর রেলবাগান এলাকার রিয়াজ উদ্দিনের ছেলে শামীম রেজা (৩৫) ও প্রান্তিকপাড়া মহল্লার সানাউল হকের ছেলে মিলন হোসেন (৩০)।
এবিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওদুদ বলেন, এ ঘটনার সাথে জড়িত মূলহোতারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। যে ৫ জনকে আটক করা হয়েছে, তা সবই লোকদেখানো। আমরা এর সুষ্ঠ তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি চাই। এসময় সাংবাদিকদের সঠিক সংবাদ ও হত্যার মূল রহস্য নিয়ে সংবাদ প্রকাশের অনুরোধ জানান তিনি। এদিকে, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার কথা অস্বীকার করে সংবাদ সম্মেলনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার এএইচএম আব্দুর রাকিব বলেন, জেম হত্যার পর থেকে এজাহারভুক্ত আসামীরা আত্মগোপনে চলে যায়।
পরবর্তীতে তথ্য-প্রযুক্তি-ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল রোববার দিবাগত রাতে তাদের একটি দূরবর্তী জেলা থেকে প্রেপ্তার করা হয়। বাকি আসামীদেরকেও গ্রেপ্তার করতে অভিযান অব্যাহত রেখেছে পুলিশ।
পুলিশ সুপার আরও বলেন, গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের আজ (মঙ্গলবার) যেকোন সময়ের মধ্যে আদালতে সোপর্দ করা হবে এবং পুলিশের পক্ষ থেকে রিমান্ডের আবেদন করা হবে। রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর হলে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে খাইরুল আলম জেমকে হত্যার রহস্য বেরিয়ে আসবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ও মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দিতে পুলিশ বদ্ধপরিকর রয়েছে বলে জানান, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। এসময় সকল স্তরের মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
এ বিষয়ে কথা বলতে মুঠোফোনে মামলার প্রধান দুই আসামী চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মোখলেসুর রহমান ও সংসদ সদস্য পদে উপনির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি সামিউল হক লিটনের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তারা কেউই ফোন রিসিভ করেননি।
হত্যাকান্ডের তিন দিন পর গত রবিবার (২২ এপ্রিল) রাত ২টার দিকে খাইরুল আলম জেমের বড় ভাই মনিরুল ইসলাম বাদী হয়ে সদর মডেল থানায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার মেয়র, দুই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ ৪৮ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।
এর আগে, এই ঘটনায় আরও ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- রনু, রোকন, রনি ও মেরাজ খোনা।
উল্লেখ্য, বুধবার (১৯ এপ্রিল) চাঁপাইনবাবগঞ্জের উদয়নমোড় এলাকায় ইফতারির বাজার করার সময় দুর্বৃত্তরা খায়রুল আলম জেমকে দেশী- বিদেশী ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাথাড়ি কুপিয়ে জখম করে। পরে স্থানীয়রা আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে অবস্থার অবনতি হলে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার সময় তার মৃত্যু হয়। পরদিন হত্যার সঠিক বিচার দাবিতে মরদেহ নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও মহাসড়ক অবরোধ করেন দলীয় নেতাকর্মীরা।