
দেশীয় চাষিদের কথা বিবেচনা করে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ করেছে সরকার। এর ফলে খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ে কেজি প্রতি প্রায় ১৫টাকা থেকে ২০টাকা পর্যন্ত বেড়েছে পেঁয়াজের দাম। তবে চাষিদের দাবী প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে প্রায় ৩০টাকা থেকে ৩৫ টাকা খরচ হলেও গ্রামের বাজারে পেঁয়াজ কেজি প্রতি ৫ টাকা থেকে ৭ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৩০টাকা থেকে ৩২টাকায়। ফলে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি করে চাষিদের লোকসান গুনতে হচ্ছে ৩টাকা থেকে ৫টাকা পর্যন্ত।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, রাজবাড়ী থেকে প্রতিদিন গড়ে ৭শ থেকে আটশত মেট্রিকটন পেঁয়াজ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হয়। এবছর জেলায় ৩২হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। দেশের উৎপাদিত মোট পেঁয়াজের ১৪ শতাংশ এ জেলায় উৎপাদিত হয়।
সরেজমিন রাজবাড়ীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, গ্রামীণ বাজারে প্রথম দিকে প্রতি কেজি পেঁয়াজ চাষিরা বিক্রি করেছে প্রকার ভেদে পঁচিশ থেকে সাতাশ টাকায় অর্থাৎ প্রতিমণ পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ১হাজার থেকে ১হাজার ৮০ টাকায়। সরকার পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ করার পর বর্তমানে তা বেড়ে দাড়িয়েছে প্রতি কেজি ৩০ টাকা থেকে ৩২ টাকায় অর্থাৎ প্রতিমণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১২শ টাকা থেকে ১২শ আশি টাকা দরে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এ পেঁয়াজ ক্রয় করে ঢাকাসহ বিভিন্ন বাজারে নিয়ে বিক্রি করে ৩১ টাকা থেকে ৩৩ টাকা অর্থাৎ মনপ্রতি ১২শ ৪০ টাকা থেকে ১৩শ ২০ টাকা দরে।
তবে এই দামে পেঁয়াজ বিক্রি করে মোটেই খুশি নয় চাষিরা। চাষীদের দাবি জ্বালানী তেল, শ্রমিক, সার কীটনাশকের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ অন্য বছরের তুলনায় এবছর বেড়েছে। এবছর এক কেজি পেঁয়াজের উৎপাদন খরচ পরেছে ৩০টাকা থেকে ৩৫ টাকা। সেখানে প্রকার ভেদে বিক্রি হচ্ছে ২৫টাকা থেকে ২৭টাকা এবং ৩০টাকা থেকে ৩২ টাকা কেজি দরে। পেঁয়াজ ঘরে রেখে দিলে ওজন কমতে থাকে। আবার গত এক সপ্তাহ ধরে বৃষ্টিপাত থাকার কারনে অনেক কৃষকের পেঁয়াজ পচে যাচ্ছে। এছাড়া আবহাওয়া অনুকুলে না থাকায় পেঁয়াজের ফলনও আশানুরুপ হয়নি। অনেক কৃষক বলছেন এভাবে লোকসান হলে আগামী বছর অন্য ফসল আবাদ করতে হবে। চাষীদের দাবি প্রতিমন পেঁয়াজ ১৫শ টাকা দরে বিক্রি করতে পারলে আসল টাকা উঠবে।
পাংশা উপজেলার সরিষা ইউনিয়নের কৃষক হাসান আলী জানান, এক শতক জমি এক বছরের জন্য লিজ (ভাড়া) নিতে হয় ১২শ টাকা দিয়ে। সেই জমিতে পেঁয়াজ চাষ করে যদি এক হাজার টাকা মন পেঁয়াজ বিক্রি করতে হয় তাহলে কিছুই থাকে না। ঈদের আগে দুইদিন হাটে পেঁয়াজ নিয়ে ফিরে এসেছি। বিক্রি করতে পারিনি। ঈদের পরে বাধ্য হয়ে ৯শ ৮০টাকা মণ দরে পেঁয়াজ বিক্রি করে দিয়েছি। এভাবে দাম পেলে আমাদের পথে বসতে হবে।
স য় বর্মণ জানান, সার ও কীটনাশকের দোকানে হালখাতা, সেচ ও লাঙ্গলের টাকা দেবার জন্য ৭০০ টাকা মন পেঁয়াজ অর্ধেক বিক্রি করতে হয়েছে। এখন বৃষ্টির কারনে পেঁয়াজে পচন দেখা দিয়েছে। তার উপর প্রতিমণ পেঁয়াজে দাম একটু বাড়ায় চারদিকে যে প্রচার তাতে চাষিদের বেঁচে থাকা কষ্টকর।
রাজবাড়ীর সদরের কোলার হাট বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসা কৃষক আকুল শেখ জানান, কৃষক মরে গেলেও কেউ দেখে না। এবছর পেঁয়াজ চাষ করতে গিয়ে একদম শেষ। লাভ তো হবেই না সারা বছর কিস্তি দিবো কি করে সেই চিন্তাই আছি। একমণ পেঁয়াজ যদি ১৫শ টাকায় বিক্রি করতে পারতাম তাহলে লাভ না আসল থাকতো।
পেঁয়াজ ব্যবসায়ী দোলোয়ার সরদার জানান, আমাদের ঢাকা থেকে মহাজন যে দাম বলে দেয় তার থেকে কেজিতে তিন টাকা থেকে সাড়ে তিন টাকা কমে আমরা পেঁয়াজ কিনে থাকি। আমাদের গাড়ী ভাড়া দিয়ে ঢাকা পাঠাতে কেজি প্রতি আড়াই টাকার বেশি খরচ হয়।
রাজবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এসএম শহিদ নূর আকবর জানান, কৃষকের এক কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে সব কিছু মিলে খরচ হয়েছে ২১ টাকা। মৌসুমের প্রথম দিকে পেঁয়াজ বিক্রি করে লোকসান হলেও এখন কৃষক পেঁয়াজ বিক্রি করে লাভবান হচ্ছে।