আওয়ামী লীগকে টানা ১৩ বছর বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় রাখার জন্য জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা আলোর পথে যাত্রা করেছি। সেই যাত্রা কেউ থামাতে পারবে না। দেশে গণতান্ত্রিক ধারা টানা অব্যাহত রয়েছে বলেই বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশের কাতারে এসেছে।
গতকাল সোমবার পটুয়াখালীর পায়রায় দেশের সর্বোচ্চ উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন ও বৃহত্তম কয়লাভিত্তিক পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। কোভিড-১৯ মহামারির প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্ব থমকে দেয়ার পর এটিই সশরীরে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন। গতকাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধনকালে দেশে শতভাগ বিদ্যুৎ কভারেজ ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা আলোর পথে যাত্রা করেছি। আলোর পথের যাত্রা সফল হয়েছে। এ চলার গতি আর কেউ থামাতে পারবে না।
এ অঞ্চলের উন্নয়ন কার্যক্রমের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দক্ষিণাঞ্চল সবচেয়ে বেশি অবহেলিত ছিল। এখন আর সে অবস্থা নাই। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে প্রত্যেকের যার যার অবস্থান থেকে অবদান রাখার তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা সে সময় আরও বলেন, ২০০১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ পিছিয়ে ছিল। এ সময় যারা ক্ষমতায় ছিল তাদের মধ্যে দেশকে এগিয়ে নেবার কোন প্রচেষ্টা ছিল না। গতকাল সোমবার ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দেশের প্রথম আলট্রা সুপার-ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির এ তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধন করতে পটুয়াখালীর পায়রা যান প্রধানমন্ত্রী। তাকে বরণ করে নিতে বর্ণিল সাজে সাজানো হয় এই জনপদ। ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবরে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি দক্ষিণ পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার অন্তর্গত রামনাবাদ নদীর পাশে ২৪৮ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ে এক হাজার একর জমিতে নির্মিত হয়েছে এবং এ প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে আল্ট্রা সুপারক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বের ১৩তম দেশে পরিণত হয়েছে।
প্রায় পাঁচ মাস ধরে পরীক্ষা চালানোর পর, পায়রা পাওয়ার প্ল্যান্টের প্রথম ইউনিটটি ২০২০ সালের মে মাসে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে। পাওয়ার ট্রান্সমিশন কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) পায়রা বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের সুবিধার্থে বেশ কয়েকটি সঞ্চালন প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
এই সঞ্চালন প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে-পায়রা প্ল্যান্ট থেকে গোপালগঞ্জ পর্যন্ত ১৬০ কিলোমিটার ৪০০ কেভি ডাবল সার্কিট লাইন নির্মাণ, ১৬৪ দশমিক ৬ কিলোমিটার আমিনবাজার-মাওয়া-গোপালগঞ্জ-মোংলা পর্যন্ত ৪০০ কেভি ডাবল সার্কিট লাইন এবং পদ্মা সেতুর কাছে ৯ দশমিক চার কিলোমিটার নদী-ক্রসিং লাইন।
পিজিসিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই প্রকল্পগুলো পায়রা ও রামপাল উভয় প্ল্যান্ট থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্যে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এবং এতে প্রায় চার হাজার ৬৫০ কোটি টাকা খরচ হবে। যার মধ্যে তিন হাজার ২৯৪ কোটি টাকা পায়রা প্ল্যান্ট ট্রান্সমিশন সুবিধার জন্য ব্যয় করা হবে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার যে দেশগুলো তাদের জনসংখ্যার ৯৮ শতাংশ ও ৭৪ শতাংশকে বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের আওতায় এনেছে, সে তালিকায় বাংলাদেশ এখন ভারত ও পাকিস্তানকে পেছনে ফেলেছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ২৫ হাজার ৫১৪ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে, যা ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে চার হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট ছিল। এর মধ্যে এক হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে। এবং ১৯ হাজার ৬২৬ মেগাওয়াট স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা হচ্ছে।
২০০৯ সালে জনসংখ্যার মাত্র ৪৭ শতাংশ বিদ্যুতের আওতায় ছিল। মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন ২২০ কিলোওয়াট থেকে ৫৬০ কিলোওয়াটে উন্নীত হয়েছে এবং বিদ্যুতের বিতরণ ক্ষতি ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে।
সাবমেরিন কেব্লের মাধ্যমে স্থানীয় চর সোনারামপুর, আশুগঞ্জ, রাঙ্গাবালী, মনপুরা, সন্দ্বীপ, হাতিয়া, নিঝুম দ্বীপ ও কুতুবদিয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আজ পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের নামফলক উন্মোচনকালে শান্তির প্রতীক এক হাজার ৩২০টি পায়রা ওড়ান এবং প্ল্যান্টের সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুম ঘুরে দেখেন। এর আগে পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র সংলগ্ন হেলিপ্যাডে প্রধানমন্ত্রী পৌঁছালে তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী কয়লা জেটিতে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রঙে সজ্জিত ২০০ জেলে সুসজ্জিত নৌকা থেকে পতাকা উড়িয়ে এবং গান বাজিয়ে শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানায়। পরে, প্রধানমন্ত্রীকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানে ‘মেমেন্টো’ উপহার দেয়া হয়।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার প্রাইভেট লিমিটেড পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস প্রধানমন্ত্রীর হাতে কোম্পানির পক্ষ থেকে অনুদানের চেক তুলে দেন। পর্যটন স্পট কুয়াকাটা থেকে পায়রা পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং এর আশপাশের এলাকাগুলোতে প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে উৎসবের আমেজ বিরাজমান ছিল।
প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মো. হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি (প্রা.) লিমিটেডের মহাপরিচালক (ডিজি) ইঞ্জিনিয়ার এ এম খুরশেদুল আলম। বিদ্যুৎ খাতের অগ্রগতির ওপর একটি অডিও-ভিডিও উপস্থাপন এবং পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর তথ্য চিত্র প্রদর্শন করা হয়।