হোলি আর্টিজানের এক দশক
রক্তাক্ত সেই রাতের ক্ষত কি শুকিয়েছে, নাকি জঙ্গিবাদ শুধু বদলেছে তার রূপ?
খন্দকার হানিফ রাজা
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬, ৬:৫৫ পিএম আপডেট: ০২.০৭.২০২৬ ৭:০৯ পিএম

হোলি আর্টিজান হামলার পরপরই রাষ্ট্রের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, হামলার সঙ্গে জড়িত পুরো নেটওয়ার্ককে চিহ্নিত করা এবং এমন একটি বিচার নিশ্চিত করা, যা দেশ-বিদেশে ন্যায়বিচারের বার্তা পৌঁছে দেবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে জঙ্গি সংগঠনের বড় অংশ ধ্বংস হলেও, এক দশক পরও বহুল আলোচিত এই মামলার বিচার চূড়ান্ত হয়নি। (দ্বিতীয় পর্বের প্রতিবেদন)

এর মধ্যেই বদলে গেছে দেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বাস্তবতা। ফলে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ কি সত্যিই জঙ্গিবাদের ঝুঁকি কাটিয়ে উঠেছে, নাকি হুমকি এখন আরও নীরব ও জটিল?

তদন্তে উঠে আসে পরিকল্পিত নেটওয়ার্ক
হামলার পর গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে পুলিশ। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়।

তদন্তে বলা হয়, হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া পাঁচ জঙ্গি অভিযানে নিহত হওয়ায় তাদের বিচারের সুযোগ নেই। তবে হামলার পরিকল্পনা, অর্থায়ন, অস্ত্র সংগ্রহ, সদস্য নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে আটজনকে অভিযুক্ত করা হয়।

তদন্তকারীরা জানান, হামলাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এর পেছনে ছিল একটি সুসংগঠিত জঙ্গি নেটওয়ার্ক, যারা দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করে রাজধানীর কূটনৈতিক এলাকাকে টার্গেট করেছিল।

মৃত্যুদণ্ড থেকে আমৃত্যু কারাদণ্ড
২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল আলোচিত মামলার রায়ে আট আসামির মধ্যে সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। আদালত রায়ে বলেন, হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তাদের ভূমিকা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

কিন্তু চার বছর পর মামলার মোড় ঘুরে যায়।

২০২৩ সালের অক্টোবরে হাইকোর্ট ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শেষে সাত আসামির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। পরে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত ব্যাখ্যা করেন, যারা সরাসরি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন, সেই পাঁচ জঙ্গি ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামির কেউ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না কিংবা নিজের হাতে কাউকে হত্যা করেননি। তবে হামলার ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও সহযোগিতার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের সর্বোচ্চ বিকল্প সাজা হিসেবে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্ত আইনগত ব্যাখ্যার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলেও নিহতদের অনেক পরিবারের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। তাদের প্রশ্ন, এত বড় নৃশংস হামলার সহযোগিদের মৃত্যুদণ্ড কেন বহাল রাখা হলো না?

বিচার এখনও শেষ হয়নি
হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ এবং দণ্ডিত আসামিরা, উভয় পক্ষই আপিল বিভাগে আবেদন করেছে। ফলে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনও হয়নি। দশ বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত জঙ্গি হামলার বিচার শেষ না হওয়ায় নিহতদের স্বজনরা হতাশ।

তাদের ভাষ্য, সময় যত গড়াচ্ছে, ততই বিচার প্রক্রিয়া মানুষের স্মৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। অথচ এই মামলার রায় শুধু কয়েকজন আসামির শাস্তি নয়; এটি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থানেরও প্রতীক।

যে ক্ষত আজও বহন করছে পরিবারগুলো
হোলি আর্টিজান হামলার শিকার পরিবারগুলোর কাছে ক্যালেন্ডারের প্রতিটি ১ জুলাই নতুন করে ফিরে আসে। এর মধ্যে পুলিশ কর্মকর্তা রবিউল ইসলামের মেয়ে জন্ম নিয়েছিল বাবার মৃত্যুর এক মাস পর। বাবাকে কোনো দিন চোখে দেখেনি সে।

তবুও বড় হতে হতে শুনেছে, তার বাবা দেশের জন্য জীবন দিয়েছিলেন। নিহত বিদেশি নাগরিকদের পরিবারও প্রতি বছর বাংলাদেশে এসে কিংবা নিজ নিজ দেশে স্মরণসভা করে প্রিয়জনদের স্মৃতি ধরে রাখার চেষ্টা করে।

নিহতদের স্বজনরা বলছেন, সময় হয়তো ক্ষত শুকিয়ে দেয়, কিন্তু শূন্যতা কখনো পূরণ করে না।

এক দশক পর নতুন বাস্তবতা
হোলি আর্টিজান হামলার পর কয়েক বছর বড় ধরনের জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেনি। এটিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হয়। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর বিভিন্ন সময়ে উগ্রবাদী প্রতীক প্রদর্শন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চরমপন্থী প্রচারণা এবং জঙ্গি-সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তির সক্রিয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জঙ্গিবাদ এখন আর আগের মতো বড় সংগঠন বা প্রকাশ্য প্রশিক্ষণকেন্দ্রের ওপর নির্ভর করছে না। বরং ছোট ছোট সেল, অনলাইন যোগাযোগ এবং এককভাবে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ ব্যক্তিদের মাধ্যমে নতুন কৌশলে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, তাই জঙ্গিবাদ মোকাবিলার কৌশলও বদলাতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান
অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) এবং পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে বড় ধরনের সংঘবদ্ধ জঙ্গি নেটওয়ার্কের অস্তিত্ব আগের মতো নেই। তাদের দাবি, গোয়েন্দা নজরদারি, প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ, অনলাইনে উগ্রবাদী প্রচারণা শনাক্তকরণ এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত কাজের ফলে সম্ভাব্য হুমকি আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। সরকারও সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বহাল থাকার কথা জানিয়েছে।

হোলি আর্টিজানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, হোলি আর্টিজান হামলা বাংলাদেশের সামনে অন্তত চারটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রেখে গেছে। প্রথমত, উগ্রবাদ কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি, অঞ্চল বা অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দ্বিতীয়ত, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে তরুণদের আচরণগত পরিবর্তনের বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে। তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন চরমপন্থী মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার অন্যতম বড় মাধ্যম। ফলে অনলাইন পর্যবেক্ষণ ও ডিজিটাল সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। চতুর্থত, শুধু অভিযান চালিয়ে জঙ্গিবাদ নির্মূল করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতৃত্ব, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ এবং রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ।

ইতিহাস যেন আর না ফিরে আসে
এক দশক আগে হোলি আর্টিজানের সেই রাত বাংলাদেশকে দেখিয়ে দিয়েছিল, কয়েকজন উগ্রবাদীর হাতে একটি দেশের ভাবমূর্তি, অর্থনীতি, কূটনীতি এবং মানুষের নিরাপত্তাবোধ কত সহজে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এরপর রাষ্ট্র জঙ্গিবাদ দমনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সাফল্যের সবচেয়ে বড় শত্রু আত্মতুষ্টি। কারণ জঙ্গিবাদ কখনো একই রূপে ফিরে আসে না; সময়ের সঙ্গে বদলে যায় তার কৌশল, সংগঠন ও প্রচারণার মাধ্যম।

শেষ কথা
দশ বছর পর হোলি আর্টিজান হামলার স্মৃতি হয়তো সময়ের ধুলায় কিছুটা চাপা পড়েছে, কিন্তু এর শিক্ষা এখনো সমান প্রাসঙ্গিক। গুলশানের সেই রক্তাক্ত রাত শুধু ২২টি প্রাণ কেড়ে নেয়নি; বদলে দিয়েছিল বাংলাদেশের নিরাপত্তা দর্শন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যক্রম এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার নীতিমালা। তবু বিচার এখনও শেষ হয়নি, কিছু প্রশ্নের উত্তরও মেলেনি।

তাই হোলি আর্টিজানের দশম বার্ষিকীতে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা একটাই, বাংলাদেশ যেন কখনো সেই অন্ধকার রাতে ফিরে না যায়। আর সে জন্য প্রয়োজন শুধু শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা নয়; প্রয়োজন মানবিক, অসাম্প্রদায়িক, সহনশীল ও সচেতন একটি সমাজ গড়ে তোলা। কারণ জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে ওঠে মানুষের মননে, পরিবারে, শিক্ষাঙ্গনে এবং রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft