শুক্রবার ৭ অক্টোবর ২০২২ ২২ আশ্বিন ১৪২৯
 

ওয়েটার থেকে শতকোটি টাকার মালিক মুক্তার, আইনের আওতায় আনার চেষ্টায় গোয়েন্দারা    করোনায় মৃত্যু ৫, শনাক্ত ৪৯১    ডেঙ্গুতে মৃত্যু ১, হাসপাতালে ভর্তি ২৪০    শান্তিতে নোবেল গেল বেলারুশ, ইউক্রেন ও রাশিয়ায়    বাজারে বাড়তি দামেই মাছ-মাংস, সবজির দামও বেশ চড়া    রান্নার কাজে সহযোগিতা করতে এসে চুরি, অজ্ঞান পার্টির ৬ সদস্য গ্রেপ্তার    টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে প্রধানমন্ত্রী ও শেখ রেহানার শ্রদ্ধা   
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতিতেই ‘না’ বেশি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ৩:৪৩ অপরাহ্ন

সম্প্রতি ১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংগঠনিক কমিটি ঘোষণা করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনটি। এর মধ্যে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ইস্ট ওয়েস্ট, ব্র্যাক, ড্যাফোডিল, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিসহ ১২টি বিশ্ববিদ্যালয় রাজধানীতে অবস্থিত। অন্য চারটি ঢাকার বাইরের। সবমিলিয়ে ৩৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এ নিয়ে সারাদেশে শুরু হয়েছে বিতর্ক। শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্ট নাগরিক এবং অভিবাবকগন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তারা বলছেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি শুরু হলে তা শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করবে এবং ছাত্ররা দলা-দলিতে জড়িয়ে পড়বে।

ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণার পর থেকে ছাত্ররাজনীতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ক্যাম্পাস রাজনীতিকে ‘না’ করে ইতোমধ্যে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে ব্র্যাক, নর্থ সাউথ, ইস্ট ওয়েস্ট, আইইউবিএটি, এআইইউবি, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিসহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।

গত ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে ‘সমন্বিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ’-এর ব্যানারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া।

এরপর থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি ঢোকানোর চেষ্টা নিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন। ক্যাম্পাসের ভেতরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হলে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। তাদের প্রশ্ন, ছাত্ররাজনীতির নামে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে হানাহানি হয়, সেটা কি এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রবেশ করবে?

গত কয়েক দিনে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবকরা ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির সুযোগ না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে সংশ্লিষ্ট উপাচার্যদের ই-মেইল করেছেন। এমন অভিভাবকের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতাদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি’।

এ নিয়ে জানতে চাইলে, সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কী নিয়ম-কানুন করল, সেখানে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাদের (প্রতিষ্ঠান) কী ব্যবস্থা হলো, সেটা প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক দলের বিষয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সেটা ঠিক করে দেয় না। আমরা কোনো হস্তক্ষেপও করি না।

তবে, এসব প্রতিষ্ঠানে রাজনীতি নিষিদ্ধ রাখার বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে এক হাত নিতেও ছাড়েননি মন্ত্রী। বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান কখনও রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে না। কারণ, রাজনীতি করা মানুষের অধিকার। কিন্তু দলীয় রাজনীতি কীভাবে হবে, সেখানে রাজনীতি যারা করবেন সেই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের বোঝাপড়া, সৌহার্দ্য থাকা উচিত।

তবে ডা. দীপু মনি বলেন, প্রতিষ্ঠান কখনও রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে না। কারণ, রাজনীতি করা মানুষের অধিকার।

এদিকে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হস্তক্ষেপ না করার বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যকে স্বাগত জানায় বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি। তবে, তারা ছাত্ররাজনীতি না থাকার বিষয়ে অনড়। দেশের সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেন বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের রাজনীতি সচেতনতা ও সম্পৃক্ততাকে নিরুৎসাহিত করে না। তবে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতর দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চলবে কি-না, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম দ্বারা নির্ধারিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে উপাচার্যরা শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিয়ম-কানুন বজায় রেখে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় সহমত ও সন্তুষ্ট। ক্যাম্পাসের বাইরে ইতিবাচক রাজনীতির ধারায় অংশগ্রহণ করার বিষয় একান্তই শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা ঠিক করবেন।

সম্প্রতি ছাত্রলীগের ঘোষিত কমিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম কমিটি নয়। ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্ররাজনীতি শুরু হয় মূলত ২০০৯ সালে, ছাত্রদলের মাধ্যমে। ২০১১ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল নামে একটি ইউনিট গঠনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ছাত্ররাজনীতি শুরু হয়। তখন ৪৯ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়।

তাদের দেখাদেখি ২০১২ সালের ২৫ নভেম্বর প্রথম সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি গঠন করে ছাত্রলীগ। ছাত্রদল ২০১৩ সাল পর্যন্ত নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটি দেয়। ওই বছর (২০১৩ সাল) থেকে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটি দেওয়া শুরু করে ছাত্রলীগও। তবে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আপত্তির মুখে কোনো দলই খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। পরে ২০১৮ সালে ৬৪৮ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেয় ছাত্রদল। সর্বশেষ চলতি বছরের ৩০ জুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটে পাঁচ সদস্যের কমিটি করে দলটি।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এক হিসাবে বলা হয়েছে, ২০২০ সাল থেকে গত আগস্ট মাস পর্যন্ত ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে সৃষ্ট সংঘর্ষে ছয়জন নিহত এবং ২২০ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ছাত্রলীগের সঙ্গে অন্য রাজনৈতিক দল, তাদের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘাতে তিনজন নিহত এবং ৫২০ জন আহত হয়েছেন।

এমন দ্বন্দ্ব, সংঘাত, হানাহানি ও সংঘর্ষের আশঙ্কায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি চান না সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তবে, কিছু শিক্ষার্থী সুষ্ঠু রাজনীতির পক্ষে। তাদের চাওয়া, রাজনীতি যেন হয় সংঘাতমুক্ত।

এ বিষয়ে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী রাসেল বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হল ও ক্যাম্পাসে সব সময়ই হানাহানি-সংঘাত লেগে থাকে। ক্যাম্পাসগুলোতে ক্ষমতাসীনদের হাতে অনেক বিরোধী ছাত্রনেতা ও কর্মীর পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থীরাও নিয়মিত হামলার শিকার হচ্ছেন। এর বাইরে নিজেদের দুই গ্রুপে মারামারি হচ্ছে, অন্যদের ওপর হামলা হচ্ছে। এমন নেতিবাচক রাজনীতি আমরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাই না। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তাদের অবস্থান আরও শক্ত করা উচিত।

ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী রিফাত তানভীর বলেন, ‘সামনে নির্বাচন। দল ভারী করতে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি ঢোকানোর চেষ্টা চলছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি চালু হলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দাদাগিরি তৈরি হবে। যেমন- মহাখালী, ওয়ারলেসসহ আশেপাশের এলাকায় সরকারি তিতুমীর কলেজের নেতাদের দাদাগিরি চলে। সেখানে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় সংঘাতের খবর পাওয়া যায় অনেক সময়। তিতুমীরের পাশেই ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি। এখানে ছাত্রলীগের কমিটি থাকলে তাদের সঙ্গে আধিপত্য বিস্তারে যে সংঘাত হবে না, এর নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না। অন্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রেও এমনভাবে আশেপাশের ইউনিট কর্তৃক প্রভাবিত হওয়ার শঙ্কা আছে।

‘যদি এমন হতো, যার ইচ্ছা রাজনীতি করবে, যার ইচ্ছা করবে না; পাবলিকের মতো সংঘাত হবে না। তাহলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি থাকলে সমস্যা ছিল না। এর ইতিবাচক দিক হলো, হঠাৎ করেই ফি বাড়ানোসহ প্রশাসন যা ইচ্ছা তা করতে পারত না। একটা জবাবদিহিতা তৈরি হতো। তবে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেটা হবে কি-না, তা অনিশ্চিত।’

স্টেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী কাব্য সাহা বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন সংঘাত-হানাহানি চলে, তেমনটা হলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতির দরকার নেই। তবে, সুষ্ঠু ধারার রাজনীতিকে আমি সবসময় স্বাগত জানাব। এটা থাকলে ছাত্রসংগঠনগুলো আমাদের অধিকার নিয়ে কথা বলবে।

ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা সুযোগ করে দিয়েছে অন্যদেরও। এরই মধ্যে কর্মী সম্মেলনের মাধ্যমে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি প্রস্তুত করেছে ছাত্রদল। সেগুলো হলো- নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, উত্তরা ইউনিভার্সিটি, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি ও স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। খুব দ্রুত এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটি দেবে তারা।

এদিকে, ছাত্র ইউনিয়নের কমিটি আছে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ও ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে। খুব দ্রুত তারা নর্থ সাউথ, ব্র্যাক ও ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটিতে কমিটি দেওয়ার চেষ্টা করছে। অন্যান্য ছাত্র সংগঠনেরও এ বিষয়ে এগিয়ে আসার সম্ভাবনা আছে।

অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন বলেন, ছাত্ররাজনীতি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে গেলে শিক্ষার মান চিরতরে বাংলাদেশ থেকে উঠে যাবে। ফলে যাদের আর্থিক অবস্থা ভালো তারা বিদেশ চলে যাবে।

বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার জন্য গত তিনদিন টেলিফোনে চেষ্টা করেও [ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক এম এম শাহিদুল হাসান বলেন, প্রত্যেকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু ক্লাব বা সংগঠন আছে। তারা বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করে। কাজেই শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করতে রাজনৈতিক সংগঠনই লাগবে, এমন নয়।

‘যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রাস্টি বোর্ড সংক্রান্ত সমস্যা আছে, তা দেখার জন্য তো শিক্ষা মন্ত্রণালয় আছে, ইউজিসি আছে। এসব সমস্যার সমাধানের জন্য রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন কোনোভাবেই অত্যাবশ্যকীয় নয়। এগুলো ভালো যুক্তি মনে হচ্ছে না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন বলেন, বাংলাদেশে কি সত্যিকার অর্থে কোনো ছাত্ররাজনীতি আছে? ছাত্ররাজনীতি তখনই সম্ভব যখন ছাত্ররা স্বেচ্ছায় কোনো একটি আদর্শের ভিত্তিতে ছাত্রদের জন্য রাজনীতি করবে। বাংলাদেশে কোনো ছাত্র সংগঠন কি ছাত্রদের জন্য রাজনীতি করে— প্রশ্ন রাখেন তিনি।

অভিভাবকের দেওয়া টাকায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চলে। তারা যদি ছাত্ররাজনীতি না চান, আমরা কোন যুক্তিতে সেটা উৎসাহিত করব— অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নান চৌধুরী বলেন।

‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা অমানবিক জীবন-যাপন করে। থাকার সমস্যা, খাবার সমস্যাসহ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত তারা। এগুলো নিয়ে ছাত্র সংগঠন বা রাজনীতি করা শিক্ষক নেতারা কি কখনও দাবি তুলেছেন?’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অধ্যাপক বলেন, দেশের বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছাত্রদের জন্য রাজনীতি করে। ছাত্রদের বিভিন্ন দাবি নিয়ে কথা তোলে। এভাবে দাবি জানানোর মাধ্যমে তারা নেতৃত্ব শেখে। আমাদের দেশে এটা তো শেখেই না, কীভাবে সোজা মেরুদণ্ড বাঁকা করতে হয়, সেটা শেখে। ছাত্রাবস্থায় তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে বলেই রাজনীতির আজ এ দুরবস্থা। দেশজুড়ে এখন তোষামোদির প্যানডেমিক চলছে। এ রাজনীতি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে গেলে শিক্ষার মান চিরতরে বাংলাদেশ থেকে উঠে যাবে। ফলে যাদের আর্থিক অবস্থা ভালো তারা বিদেশ চলে যাবে এবং আর আসবে না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নষ্ট হলে আরও বেশি শিক্ষার্থী দেশ থেকে বাইরে চলে যাবে। দেশের টাকাও বিদেশে চলে যাবে।

‘সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক প্রহরী দরকার। কারও ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য, কারও ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি চালুর দাবির পেছনে দেশের বা ছাত্রদের ন্যূনতম স্বার্থ জড়িত নয়।’

শিক্ষাবিদ ও ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নান চৌধুরী বলেন, ছাত্রজীবনে আমরা তুখোড় রাজনীতি করেছি। তাই ছাত্ররাজনীতি করা ঠিক নয়, এটা বলতে পারব না। কিন্তু এটুকু বলতে পারি, স্বাধীনতার আগের এবং পরের ছাত্ররাজনীতির মধ্যে তফাত রয়েছে। বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে ছাত্ররাজনীতির অবদান আছে। স্বৈরাচার প্রতিরোধে ছাত্রদের অবদান আছে। তখন ছাত্ররাজনীতি ছিল, এখনকার মতো অপরাজনীতি ছিল না।

‘স্বৈরাচার বিতাড়নে ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজন ছিল, ওই সময় ছাত্ররা মাঠে ছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের জন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলের প্রয়োজন ছিল, সেক্ষেত্রে ছাত্রদের অবদান আমরা অস্বীকার করব না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ছাত্ররা, আমরা অবদান রেখেছি। এ তিনটি ক্ষেত্রে অবদান ছাড়া স্বাধীনতার পর ছাত্ররাজনীতিতে বিভক্তি, হানাহানি শুরু হয়। সবাই আত্ম-অন্বেষণে লিপ্ত হয়।’

“বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে বলা আছে, শিক্ষার্থীদের পরিপূর্ণ নিরাপত্তা দিতে হবে। তাই সংঘাতময় এ ছাত্ররাজনীতিকে যদি আমরা উৎসাহিত করি, তাহলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। ফলে বিত্তবানরাও ছেলে-মেয়েদের এ দেশে রাখবে না। পড়াশোনার জন্য দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেবে। অভিভাবকদের কাছে আমরা জানতে চেয়েছি, তারা ছাত্ররাজনীতি চান কি না। তারা ‘চান না’ বলে জানিয়েছেন। এসব অভিভাবকের দেওয়া টাকায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চলে। তারা যদি ছাত্ররাজনীতি না চান, আমরা কোন যুক্তিতে সেটা উৎসাহিত করব?”

অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নান চৌধুরী বলেন, সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্ট আইনের অধীন। এ আইনের ১৭ ধারায় বলা আছে, সবার জন্য সমতার বিধান করতে হবে। একই প্রাঙ্গণে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন থাকলে সবার জন্য সমান অধিকার দেওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া, অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্ষুদ্রাকারের, করিডোরগুলোও ছোট। ‘আমার ভাই, তোমার ভাই’ স্লোগান দেওয়ার মতো জায়গা সেখানে নেই। ছাত্ররাজনীতির কারণে এ ক্ষুদ্র জায়গায় সংঘাত হলে জীবনহানির সম্ভাবনা প্রচুর। যে ছাত্ররাজনীতিতে আদর্শবাদ নেই, জীবনহানির শঙ্কা আছে, সেখানে আমাদের অ্যাসোসিয়েশন (বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি) যা বলেছে, তাকেই আমরা সঙ্গত বলে বিবেচনা করছি।

এ শিক্ষাবিদের মতে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫০ শতাংশ শিক্ষা কার্যক্রম আর ৫০ শতাংশ সহশিক্ষা কার্যক্রম রয়েছে। দুটোর সংমিশ্রণে এত বেশি সময় দিতে হয় যে তাদের রাজনীতি করার অবকাশ থাকে না। সুযোগ দিলেও অনেকে রাজনীতি করতে পারবে না। ক্লাসের পাঠদান ও মূল্যায়ন পদ্ধতি এমন যে শিক্ষার্থীদের সারাক্ষণই কোনো না কোনোভাবে ব্যস্ত থাকতে হয়। এর ওপর সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এত বেশি, তাদের হাতে সময়ই থাকে না। এসব কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থী রাজনীতি চায় না। তারা না চাইলে আমরা কীভাবে দেব?

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির বিষয়ে কথা বলতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান, সচিব, একজন সদস্য ও একজন পরিচালককে ফোনে কল দেওয়া হলেে এ বিষয়ে কেউই মুখ খুলতে রাজি হননি।

প্রথমে ইউজিসি সচিব ড. ফেরদৌস জামানের কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হয়। তিনি কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দকে কল করা হলে তিনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার পরিচালক মো. ওমর ফারুকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

মো. ওমর ফারুকের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ইউজিসি সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে’। এর বাইরে কিছু বলতে চাননি তিনি। তবে তার পরামর্শ, এ বিষয়ে চেয়ারম্যান ভালো বলতে পারবেন। জানতে চাইলে ইউজিসি চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক দিল আফরোজা বেগম বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য নয়।’

-জ/অ

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175,+8801711443328, E-mail: dailyjobabdihi@gmail.com, jobabdihionline@gmail.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft